ডিব্রুগড়: ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতার সংঘাত নতুন নয়। কিন্তু অসমের ডিব্রুগড়ে ব্রহ্মপুত্র নদে এক ব্যক্তির দুধ ঢালার পর খালি প্যাকেটটিও জলে ছুড়ে ফেলার দৃশ্য ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে, নদীতে দুধ ঢেলে ধর্মীয় আচার পালন করছেন এক ব্যক্তি। তার পর খালি দুধের প্যাকেটটি নদীতে ফেলে দিচ্ছেন তিনি। ঘটনাটি সামনে আসতেই প্রশ্ন তুলেছেন নেটাগরিকদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, ধর্মীয় বিশ্বাস যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু সেই বিশ্বাসের নামে নদীকে দূষিত করার অধিকার কারও নেই।
গত ৩১ অক্টোবর এক্স-এ ভিডিয়োটি পোস্ট করেন নবীন রেড্ডি নামে এক ব্যক্তি। তাঁর পোস্টে লেখা, ধর্মীয় আচারের অংশ হিসেবে ব্রহ্মপুত্রে দুধ ঢালা বিশ্বাসের বিষয় হতে পারে। কিন্তু দুধ শেষ হওয়ার পর খালি প্যাকেট নদীতে ফেলে দেওয়া কোনও ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর কথায়, “নিজের বিশ্বাসকে সম্মান করুন, কিন্তু প্রকৃতিকেও সম্মান করতে শিখুন।” একই সঙ্গে ডিব্রুগড়ের ওই নদী তীরবর্তী এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, নদীর ধারে মানুষের যাতায়াত যেখানে নিয়মিত, সেখানে বর্জ্য ফেলার উপযুক্ত ব্যবস্থা কেন নেই?
https://x.com/navin_ankampali/status/2116485752909643805?a=7bKEMOfxzAZviGY9t5E&s=20
ভিডিয়োটি ছড়িয়ে পড়তেই সমাজমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই ওই ব্যক্তির আচরণের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, নদীকে পবিত্র মনে করলে তাকে দূষণমুক্ত রাখার দায়িত্বও পালন করা উচিত। খালি দুধের প্যাকেট নদীতে ফেলে দেওয়া শুধু অসচেতনতার পরিচয় নয়, পরিবেশের প্রতিও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। তবে বিতর্ক শুধু প্লাস্টিক বা দুধের প্যাকেট নদীতে ফেলে দেওয়াকে ঘিরে আটকে থাকেনি। নেটাগরিকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, নদীর জলে দুধ ঢালার ফলে জলজ প্রাণীদের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
তাঁদের মতে, দুধ প্রাকৃতিক খাদ্যবস্তু হলেও নদীর জলে বেশি পরিমাণে মিশলে তা দূষণের কারণ হয়ে উঠতে পারে। দুধের মধ্যে থাকা জৈব পদার্থ পচে যাওয়ার সময় অণুজীব জলের দ্রবীভূত অক্সিজেন ব্যবহার করে। ফলে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে মাছ-সহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এই প্রসঙ্গে পরিবেশবিদদের একাংশের বক্তব্য, নদীতে কোনও জৈব পদার্থের প্রভাব নির্ভর করে তার পরিমাণ, জলের প্রবাহ এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের উপর। প্রতীকী ভাবে সামান্য কিছু অর্পণ করা আর বিপুল পরিমাণে দুধ বা অন্য জৈব পদার্থ নদীতে ঢেলে দেওয়া এক বিষয় নয়। তাই ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ভারতের বিভিন্ন নদীকে ঘিরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বহু দিনের। পুজো, তর্পণ কিংবা নানা পার্বণে নদীতে ফুল, খাবার, দুধ ও অন্যান্য সামগ্রী অর্পণ করেন অনেকে। কিন্তু সেই সব সামগ্রী যদি প্লাস্টিক, পলিথিন বা অন্য অপচনশীল বর্জ্যের সঙ্গে নদীতে ফেলা হয়, তা হলে দূষণের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। ফলে নদীকে পবিত্র মনে করার বিশ্বাসের সঙ্গে তার পরিচ্ছন্নতা রক্ষার দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর আগেও মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীতে বিপুল পরিমাণ দুধ ঢালার ঘটনা ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শেষে প্রায় ১১ হাজার লিটার দুধ নদীতে ঢালা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনা পরিবেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাবের প্রশ্নে জাতীয় পরিবেশ আদালত (এনজিটি) পর্যন্ত গড়ায়। নদীর জলে এত বিপুল পরিমাণ জৈব পদার্থ মেশার ফলে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদগুলির কাছে রিপোর্ট চেয়েছিল আদালত।
ডিব্রুগড়ের সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই ফের সামনে এনেছে পুরনো প্রশ্ন—ধর্মীয় বিশ্বাস ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব কী ভাবে? বিশ্বাস পালনের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই নদী, জলজ প্রাণী এবং পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও এড়ানো যায় না। আর সেই দায়িত্ব পালনে শুধু প্রশাসন নয়, প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতাও জরুরি। ব্রহ্মপুত্রের জলে দুধ ঢালার দৃশ্যের চেয়েও তাই বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে খালি প্যাকেটটি, যা মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা শুধু আচার-অনুষ্ঠানে নয়, দৈনন্দিন আচরণেও প্রকাশ পাওয়া প্রয়োজন।




