কলকাতা, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-র সংঘর্ষ ঘিরে উত্তেজনা এখনও কাটেনি। তার মধ্যেই শুক্রবার সকালে পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। যাদবপুরে ‘দেশবিরোধী’ কার্যকলাপ বা স্লোগান বরদাস্ত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে তাঁর মন্তব্য, এমন কিছু হলে ফের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ হবে। তাঁর নিশানায় ছিল পূর্বতন তৃণমূল সরকারও। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যাদবপুরে ‘দেশবিরোধীদের প্রশ্রয়’ দেওয়া হয়েছে। এখন সরকার বদলেছে, তাই পরিস্থিতিও বদলাবে বলে দাবি মন্ত্রীর।
শুক্রবার সকালে প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে যাদবপুরের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরব হন দিলীপ। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান ওঠার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আগে যখনই এরকম কিছু হয়েছে, বাকিরা কেউ প্রতিবাদ করেনি। তৃণমূল পুষে রেখেছিল দেশবিরোধীদের।’’ তাঁর দাবি, অতীতেও যাদবপুরে তাঁর দলের কর্মীরা প্রতিবাদ করেছেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে দিলীপ বলেন, ‘‘আমাদের লোকেরা ওখানে আগেও সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করেছিল।’’
এর পরেই আরও কড়া বার্তা দেন তিনি। দিলীপের কথায়, ‘‘আবার যদি ওখানে দেশবিরোধী গতিবিধি দেখা যায় বা স্লোগান ওঠে, আবার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হবে।’’ শুধু যাদবপুরের পরিস্থিতি নয়, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের প্রসঙ্গও টেনে আনেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘‘পরিবর্তন হয়েছে। সব কিছুই হবে। ছ’মাস অপেক্ষা করুন।’’
দিলীপের এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিক ভাবেই যাদবপুরের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের রাজনৈতিক অভিঘাত আরও বাড়ল। বুধবার রাতের ঘটনায় এমনিতেই উত্তপ্ত ছিল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। অরবিন্দ ভবনে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি জেনারেল বডি মিটিং (জিবি) চলাকালীন পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে ওঠে। অভিযোগ, বাইরে থেকে এবিভিপি-সমর্থকেরা এসে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকে ভাঙচুর চালান। পাল্টা বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সদস্যদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ তোলে এবিভিপি।
ঘটনার জেরে কয়েক জন এবিভিপি নেতা ও সমর্থককে চিকিৎসার জন্য কেপিসি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছন যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। তিনি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলিকে নিশানা করে সতর্কবার্তাও দেন।
কিন্তু সংঘর্ষের সূত্রপাত ঠিক কোথায়? কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হল? বাইরে থেকে কারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিলেন? ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগের সত্যতা কতটা? এই সব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। সেই কারণেই ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্তের পথে হাঁটছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা রয়েছে।
শুধু তদন্ত কমিটি নয়, এ দিন বিকেল ৩টে নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অংশীদারকে নিয়ে একটি বৈঠকও হওয়ার কথা। ক্যাম্পাসে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই বিষয়েই সেখানে আলোচনা হতে পারে। সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এরই মধ্যে শুক্রবার দুপুরে ক্যাম্পাসের ভিতরে মিছিলের ডাক দিয়েছে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি। তাতে ছাত্রছাত্রীদের অংশ নেওয়ার কথা। ফলে এক দিকে তদন্ত কমিটি এবং কর্তৃপক্ষের বৈঠক, অন্য দিকে বাম ছাত্র সংগঠনগুলির মিছিল দুইয়ের মধ্যে যাদবপুরে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সে দিকেই নজর সকলের।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষ অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি, তৃণমূলপন্থী ছাত্র রাজনীতি এবং এবিভিপি-র সক্রিয়তা ঘিরে ক্যাম্পাসে টানাপড়েন রয়েছে। কিন্তু এ বারের ঘটনার পর রাজনৈতিক চাপানউতোর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজ্য রাজনীতিতেও পৌঁছে গিয়েছে। তার মধ্যেই মন্ত্রীর মুখে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর হুঁশিয়ারি সেই উত্তাপ আরও বাড়াল।
এখন প্রশ্ন, তদন্তে বুধবার রাতের সংঘর্ষের জন্য দায়ী কারা বলে উঠে আসে এবং ক্যাম্পাসে শান্তি ফেরাতে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ করে। তবে তার আগেই দিলীপ ঘোষের মন্তব্যে যাদবপুরের বিতর্ক যে আরও রাজনৈতিক রং পেল, তা নিয়ে সংশয় নেই।