নিউজ ডেস্ক: ১৮০০ শতকের আগে পোশাক তৈরির প্রক্রিয়া ছিল বেশ ধীরগতির। মানুষ নিজেদের কাপড় নিজে তৈরি করত অথবা দর্জি দিয়ে বানাত। শিল্প বিপ্লবের পর টেক্সটাইল মেশিন ও সেলাই মেশিনের আবিষ্কার পোশাক তৈরির গতি বাড়িয়ে দেয়। এই সময় প্রথম "রেডি-মেড" কাপড়ের ধারণা তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ফ্যাশনের চাহিদা বাড়তে থাকে। তখন ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো বছরে শুধু চারটি ঋতু - গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত ও বসন্তের জন্য পোশাক তৈরি করত।
'ফাস্ট' শব্দটিই বলে দেয় এটি একটি ব্যবসায়িক মডেল, যা সর্বশেষ ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুযায়ী অস্বাভাবিক কম মূল্যে ও দ্রুততার সাথে পোশাকের ডিজাইন, উৎপাদন এবং প্রচারের উপর গুরুত্ব দেয়। বিখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ড জ়ারার উদ্দেশ্য ছিল মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে একটি পোশাক তৈরি করে দোকানে পৌঁছে দেওয়া। ২০২২ সালে চীনা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম শেইন ১০ দিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। অন্যান্য ফাস্ট ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিক্লো, এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্ক, ম্যাঙ্গো এবং অ্যাসোস।
এই ‘ফাস্ট ফ্যাশনে’র সাথে জড়িয়ে আছে কয়েকটি নির্মম দিক। এর দ্রুততা,স্বল্প ব্যয়, বিপুল পরিমাণ উৎপাদন এবং ঘন ঘন পণ্য পরিবর্তনের ব্যবসায়িক মডেলের নীচে চাপা পড়ে শ্রমিকরা। ‘ফাস্ট ফ্যাশনে’ মুনাফা সর্বোচ্চ করার জন্য সস্তা কাঁচামাল এবং সস্তা শ্রমের প্রয়োজন হয়। এই মডেল কারখানাগুলোকে বাধ্য করে যথাসম্ভব খরচ কমাতে। আর সেখানে সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু সস্তার শ্রমিক। ইতিহাস দেখিয়েছে যে, এই শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে বিফল। পৃথিবীতে বেশিরভাগ পোশাক উৎপাদন হয় আফ্রিকা, এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে, যেখানে শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা খুবই ক্ষীণ। অনেকেই প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা কাজ করে, খুব সামান্য অর্থ উপার্জন করে এবং অতিরিক্ত কাজ করতে অস্বীকার করলে প্রতিশোধের শিকার হয়। তারা অনিরাপদ পরিবেশেও কাজ করে, যার মধ্যে রয়েছে বদ্ধ ঘর এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার গার্মেন্ট শিল্পে শ্রমিকদের ওপর চলা শোষণের তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে। এই চারটি দেশে প্রশাসন ও ফ্যাক্টরি মালিকরা পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের ইউনিয়নে যোগদানের বা প্রতিবাদের অধিকার খর্ব করে। বাংলাদেশে ইউনিয়ন গঠনে সমস্যা, ভারতের অনেক হোমওয়ার্কারকে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় শ্রমিকরা ইউনিয়ন কার্যক্রমের কারণে বেতন কম পাওয়া, হয়রানি এবং চাকরি হারানোর শিকার হন।
উৎপাদন চলাকালীন এবং পরেও ফাস্ট ফ্যাশনের পরিবেশের উপর প্রভাব রয়েছে। সামগ্রিকভাবে ফ্যাশন শিল্প ১০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে জলের ব্যবহার, রং ও রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগের ফলে পরিবেশ দূষণ হয়। ফাস্ট ফ্যাশন, তার কম দাম এবং নিম্নমানের পণ্যের জন্য আমাদের মাত্র কয়েকবার পড়া একটি পোশাকও ফেলে দিতে উৎসাহিত করে। এই পোশাকগুলো শেষ পর্যন্ত চিলির আতাকামা মরুভূমির তথাকথিত "পোশাকের কবরস্থান" সহ বিশ্বের বিভিন্ন ল্যান্ডফিলে গিয়ে জমা হয়। এই কোম্পানিগুলো প্রধানত সিন্থেটিক ফাইবার - পলিয়েস্টার, নাইলন এবং অ্যাক্রিলিক ব্যবহার করে। এধরনের উপকরণ উৎপাদন করা সস্তা, কিন্তু এগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে তৈরি হয়। তাই, এগুলি পচনশীল নয় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ল্যান্ডফিলে থেকে যাবে।
সামগ্রিকভাবে, ফাস্ট ফ্যাশন হলো ব্যাপক ভোগবাদেরই ফল; যার ফলস্বরূপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রম সস্তায় আউটসোর্স করার মতো অনৈতিক কার্যকলাপ দেখা দিয়েছে। তাছাড়া পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা ও যেসব কোম্পানি টেকসই ও নৈতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে না তাদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পচনশীল তন্তু ব্যবহার করে পোশাককে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার উন্নত উপায় খুঁজে বের করতে হবে। শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি, তাদের কাজের সঠিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করা কম্পানির দায়িত্বের মধ্যে পরে। যাদের তৈরি পোশাক আমরা পড়ি তাদের ভুলে না যাওয়াটা আমাদের মানবিক কর্তব্য।
