পুরুলিয়া: মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানকে সামনে রেখে জঙ্গলমহলে তৈরি হতে চলেছে প্রথম অভয়ারণ্য। পুরুলিয়ার কোটশিলা ও ঝালদা বনাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে এই অভয়ারণ্য গড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, সাধারণত অভয়ারণ্য তৈরির সময় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু পুরুলিয়ার প্রস্তাবিত এই অভয়ারণ্যে সেই পথে হাঁটা হচ্ছে না। স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়েই সংরক্ষণ ও পর্যটন দুই পরিকল্পনাই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত অভয়ারণ্যটি কোটশিলা বনাঞ্চলের সিমনি ও নোয়াহাতু বিট এবং ঝালদা বনাঞ্চলের কলমা বিটকে ঘিরে প্রায় ৩৬০৯.৪০ হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত হবে। মোট ২১টি মৌজা এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারে। ইতিমধ্যেই অভয়ারণ্য তৈরির জন্য ডিটেলস প্রজেক্ট রিপোর্ট বা DPR অরণ্য ভবনে জমা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রস্তাবটি বর্তমানে সরকারি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
এই এলাকার বিশেষত্ব হল এখানকার সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। বন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের সঙ্গে সংযুক্ত এই এলাকায় আনুমানিক ছয়টি পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘ এবং তিনটি শাবক রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১০টি স্লথ বিয়ার বা ভাল্লুকের উপস্থিতির কথাও জানা গিয়েছে। বিরল হানি ব্যাজারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া প্যাঙ্গোলিন, হায়না, বার্কিং ডিয়ার, সজারু এবং বন্য শূকরের মতো বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এই জঙ্গলকে নিজেদের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করে।
২০২২ সালের শুরু থেকেই এলাকায় ফের চিতাবাঘের উপস্থিতির প্রমাণ মিলতে শুরু করে। গবাদি পশুর মৃতদেহ উদ্ধারের পর ক্যামেরা ট্র্যাপে চিতাবাঘের ছবি ধরা পড়ে। তারপর থেকে নিয়মিত নজরদারিতে তাদের গতিবিধি ধরা পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, চিতাবাঘের কারণে গবাদি পশুর ক্ষতি হলেও তাঁরা বন্যপ্রাণীদের উপস্থিতিকে জঙ্গলের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই দেখেন। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এই সহাবস্থানের অভিজ্ঞতাকেই অভয়ারণ্য প্রকল্পের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এলাকায় সংরক্ষণের পাশাপাশি তৈরি হতে পারে নেচার ট্রেইল, ট্রেকিং রুট, ওয়াচটাওয়ার, জলাধার, প্রকৃতি পাঠশালা, ইকো-গাইড পরিষেবা, রক ক্লাইম্বিং ও ক্যাম্পিংয়ের মতো পরিকাঠামো। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে জিপসি সাফারি এবং প্রজাপতি বাগানের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের উপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ১৫টি যৌথ বন পরিচালন কমিটি সংরক্ষণ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পাশাপাশি ক্যামেরা ট্র্যাপ, স্থায়ী ভেজিটেশন প্লট এবং জলবায়ু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিয়মিত গবেষণা ও নজরদারির পরিকল্পনা রয়েছে।
কলমা বিটের প্রায় ১৮৮.২৭ হেক্টর এলাকায় ঔষধি উদ্ভিদের উপস্থিতিও প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। জল ও মাটি সংরক্ষণ, দাবানল নিয়ন্ত্রণ এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সুরক্ষার মতো বিষয়গুলিও প্রস্তাবিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকছে।
বন দফতর সূত্রে খবর, সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি আর্থিক বছরের মধ্যেই অভয়ারণ্য সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পুরুলিয়ার বনাঞ্চলে একদিকে যেমন বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আরও শক্তিশালী হতে পারে, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি হতে পারে।