নয়াদিল্লি: ভারতের বহু প্রতীক্ষিত মুম্বই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্প নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন জাপানের প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা। প্রকল্পের দীর্ঘ বিলম্বের জন্য সরাসরি ভারতীয় মন্ত্রী এবং আমলাদের দায়ী করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অস্বাভাবিক দেরি, সমন্বয়ের অভাব এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থতার কারণেই সময়মতো এগোতে পারেনি ভারতের প্রথম হাই-স্পিড রেল প্রকল্প। যদিও এই অভিযোগকে 'বাস্তবতা-বিবর্জিত' বলে উড়িয়ে দিয়েছে ভারত সরকার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাকিহারা বলেন, ভারত-জাপান সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক এই বুলেট ট্রেন প্রকল্প। কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতির পথে প্রযুক্তিগত বা আর্থিক সমস্যা যতটা না বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে প্রশাসনিক জটিলতা। তাঁর দাবি, বহু ক্ষেত্রে ভারতীয় পক্ষের তরফে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বারবার বৈঠক হলেও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। এর ফলে প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সূচি বারবার ভেঙে পড়েছে।
প্রাক্তন জাপানি মন্ত্রীর অভিযোগ, জাপান শুরু থেকেই প্রকল্পে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু ভারতীয় প্রশাসনের ধীরগতির কারণে সেই সহযোগিতার পূর্ণ সুফল পাওয়া যায়নি। তাঁর কথায়, দুই দেশের মধ্যে যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, প্রশাসনিক স্তরে তা যথাযথভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
তবে মাকিহারার এই মন্তব্যের পরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় বিদেশ মন্ত্রক। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, প্রাক্তন জাপানি মন্ত্রীর বক্তব্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত। প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতির সঙ্গে তাঁর মন্তব্যের যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, ভারত ও জাপানের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বুলেট ট্রেন প্রকল্পে দুই দেশের সহযোগিতা আগের মতোই অব্যাহত রয়েছে।
কেন্দ্রের দাবি, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভূমি অধিগ্রহণ। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রে জমি সংক্রান্ত আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘ সময় কাজ শুরু করা যায়নি। তবে বর্তমানে অধিকাংশ জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। গুজরাটে ভায়াডাক্ট, স্টেশন, সেতু ও ট্র্যাক নির্মাণ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। মহারাষ্ট্রেও কাজের গতি বেড়েছে। ইতিমধ্যে দেশের প্রথম সমুদ্রতল রেল টানেল নির্মাণের কাজও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে যৌথভাবে মুম্বই-আহমেদাবাদ হাই-স্পিড রেল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রায় ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরে জাপানের অত্যাধুনিক শিনকানসেন প্রযুক্তির ট্রেন চলবে। ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার গতিবেগে চলতে সক্ষম এই ট্রেন চালু হলে মুম্বই থেকে আহমেদাবাদ পৌঁছতে সময় লাগবে মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১.০৮ লক্ষ কোটি টাকা। এর বড় অংশই অত্যন্ত কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে দিচ্ছে জাপান। তবে ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, কোভিড-১৯ অতিমারির ধাক্কা, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং একাধিক প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পের সময়সীমা ও ব্যয়— দু'টিই বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রাক্তন জাপানি মন্ত্রীর মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্ক উস্কে দিলেও, কেন্দ্রের দাবি একটাই— অতীতের বাধা কাটিয়ে প্রকল্প এখন দ্রুত এগোচ্ছে। ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন চালুর লক্ষ্যে ভারত ও জাপান যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই প্রকল্প দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবেই থেকে যাবে।