নিউজ ডেস্ক: গঙ্গার গতিপ্রকৃতির বিপজ্জনক পরিবর্তনে অশনিসঙ্কেত দেখছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। লাগাতার ভাঙনের জেরে ফুলহার নদীর দিকে ক্রমাগত সরে আসছে গঙ্গার মূল স্রোত। এক দশক আগেও যেখানে দুই নদীর মধ্যে পাঁচ কিলোমিটারের নিরাপদ ভূখণ্ড ছিল, তা আজ ক্ষয়ে দাঁড়িয়েছে মেরেকেটে ৫০০ মিটারে। সেচ দফতরের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় স্পষ্ট, অবিলম্বে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ভাঙন না রুখলে আগামী এক থেকে দু’বছরের মধ্যেই গঙ্গা গ্রাস করবে ফুলহারকে। আর এমনটা ঘটলে ফারাক্কা ব্যারাজের উপযোগিতা যেমন প্রশ্নের মুখে পড়বে, তেমনই হুগলি নদীতে মিষ্টি জলের জোগান শুকিয়ে চিরতরে অচল হয়ে যেতে পারে কলকাতা বন্দর।
বিশেষজ্ঞদের মূল উদ্বেগ ফারাক্কা ব্যারাজের জলধারণ ও বণ্টন ক্ষমতা নিয়ে। গঙ্গার গতিপথ যদি একবার ফুলহারের খাতে ঢুকে পড়ে, তবে জলস্রোত ফারাক্কাকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে সরাসরি বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। ফুলহার নদীতে কোনও রেগুলেটর বা লকগেট নেই, ফলে সেই জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের অধিকার ভারতের হাতে থাকবে না। ফারাক্কায় জল না পৌঁছালে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে ফিডার ক্যানাল দিয়ে যে জল ছাড়া হয়, তা কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। এমনিতেই পলি জমার কারণে নাব্যতা হারিয়ে ধুঁকছে কলকাতা বন্দর। ফিডার ক্যানালের জলের তোড়ে নিয়মিত পলি না ধুয়ে গেলে বন্দরটি অকেজো হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিকভাবে পূর্বাঞ্চলের বাণিজ্যে বড়সড় ধস নামাবে।
নদী বিশেষজ্ঞদের মতে,এই ভৌগোলিক বিপর্যয় কোনও একটি রাজ্যের একার চেষ্টায় সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। মালদহ বা মুর্শিদাবাদ প্রান্তে কেবল বোল্ডার ফেলে বা ‘স্পার’ তৈরি করে গঙ্গার এই আগ্রাসী রূপ ঠেকানো যাবে না। বিহার থেকে নেমে আসা বিপুল জলধারা এবং সেখানকার অববাহিকায় তৈরি হওয়া ভাঙনও এর জন্য সমান দায়ী। ফলে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ড এই তিন পড়শি রাজ্যকে যৌথ পরিকল্পনায় নামতে হবে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরনো ‘সাক্রিগলি’ চ্যানেলকে পুনরায় সক্রিয় করার ভাবনা রয়েছে।
ঝাড়খণ্ডের রাজমহল পাহাড় সংলগ্ন এই মৃতপ্রায় নদীপথটি যদি পুনরুজ্জীবিত করা যায়, তবে অতিরিক্ত জলের চাপ ঘুরিয়ে সরাসরি ফারাক্কায় ফেলা সম্ভব। এতে বাংলায় নদীপাড়ের উপর সরাসরি জলের আঘাত অনেকটাই স্তিমিত হবে।
ইতিমধ্যেই রাজ্য জলসম্পদ দফতর সমীক্ষা শেষ করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প রিপোর্ট দিল্লির দরবারে পেশ করেছে।
কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের কাছে আর্জি জানানো হয়েছে, কেন্দ্র যেন দ্রুত তিন রাজ্যকে নিয়ে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে বসে। পাশাপাশি শুষ্ক মরসুমে জলের জোগান ঠিক রাখতে নদীতে ‘মাইক্রো ড্যাম’ বা ছোট বাঁধ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলি যৌথভাবে কড়া পদক্ষেপ না করলে নদী মানচিত্রের এই পরিবর্তন দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষত তৈরি করবে।
