নিউজ ডেস্ক: সংস্কৃতি বলতে শুধু বিপুল তথ্য, সাধারণ জ্ঞান কিংবা সর্বদা নানা বিষয়ে মতামত দেওয়ার ক্ষমতাকে বোঝেননি ফরাসি দার্শনিক জিল দেল্যুজ। বরং এই ধরনের সঞ্চিত জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রদর্শন তাঁর কাছে অনেক সময় চিন্তার স্বাধীনতার বিপরীত। কোনো নির্দিষ্ট কাজের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে কাজ শেষ হলে তা ভুলে গিয়ে নতুন করে চিন্তা শুরু করাই ছিল তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি।
তাঁর কাছে স্থায়ী হয়ে ছিলেন স্পিনোজার মতো কয়েকজন চিন্তক। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বুদ্ধিজীবীদের আড্ডা কিংবা অবিরাম কথোপকথনের মধ্যেও দেল্যুজ সংস্কৃতির প্রকৃত প্রাণ খুঁজে পাননি। তাঁর মতে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সামাজিক যোগাযোগের চেয়ে একটি চলচ্চিত্র, চিত্রকর্ম, সুর বা অন্য কোনো শিল্পবস্তুর সঙ্গে আকস্মিক সংযোগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চিন্তার প্রকৃত পরিবর্তন ঘটে এমন সংঘাত ও সংযোগের মধ্য দিয়েই।
দেল্যুজের দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ‘ভাঁজ’। লাইবনিৎসের মোনাডের ধারণাকে পুনর্ব্যাখ্যা করে তিনি দেখিয়েছিলেন, বাইরের জগতের কোনো সরাসরি জানালা না থাকলেও বিশ্বের অসংখ্য অভিজ্ঞতা মানুষের চেতনার ভেতরে ভাঁজ হয়ে থাকতে পারে। তাঁর এই ধারণার সঙ্গে নিজেদের কাজের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন ওরিগামি শিল্পী এবং সার্ফাররাও। দেল্যুজের কাছে এই ঘটনাই দর্শনের প্রাতিষ্ঠানিক সীমানা অতিক্রম করে শিল্প, প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার উদাহরণ।
শিল্পের ক্ষেত্রেও তিনি উচ্চ ও নিম্ন সংস্কৃতির প্রচলিত বিভাজন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারমেলো বেনে, বব উইলসন, জোসেফ লোসি কিংবা ভিনসেন্ট মিনেলির পাশাপাশি কমেডিয়ান বেনি হিলের কাজ থেকেও তিনি চিন্তার উদ্দীপনা খুঁজে পেয়েছেন।
তবে আধুনিক সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল গভীর। তাঁর মতে, সাংবাদিকতাধর্মী বইয়ের বিস্তার, সাহিত্যের অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এবং বাজার ও বিজ্ঞাপননির্ভর প্রকাশনা-গণমাধ্যম সাহিত্য ও শিল্পের সৃজনশীলতাকে সংকুচিত করছে। টেলিভিশনের সাহিত্যিক টকশোও তাঁর চোখে অনেক সময় সমালোচনাকে বই বিক্রির প্রচারে পরিণত করে।
তবু দেল্যুজ সম্পূর্ণ হতাশ ছিলেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি দুর্বল হলেও চিন্তা কখনও পুরোপুরি বিলীন হয় না। কোনো যুগে ছোড়া একটি চিন্তার ‘তীর’ হয়তো তখন গ্রহণ করা হবে না, কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো সংবেদনশীল মানুষ বা সমাজ সেটিকে তুলে নিয়ে নতুন দিকে ছুড়ে দিতে পারে।