বর্ধমান: ধানের শিষে এবারও ফলন এসেছে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে পেকে উঠেছে সুগন্ধি গোবিন্দভোগ। কিন্তু ধান ঘরে তোলার মুখে মুখে হাসি নেই দক্ষিণ দামোদরের চাষিদের। গত বছর যে সময়ে গোবিন্দভোগের দাম নিয়ে আশাবাদী ছিলেন তাঁরা, এ বার সেই জায়গাতেই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বাজারে প্রত্যাশিত দাম মিলছে না। তার উপর বিদেশের বাজারে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে মহারাষ্ট্রের ‘কোলাম’। ফলে শুধু এ মরসুমের দাম নয়, গোবিন্দভোগের ভবিষ্যৎ বাজার নিয়েও চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।
দক্ষিণ দামোদরের গোবিন্দভোগের আলাদা কদর দীর্ঘদিনের। সুগন্ধ, স্বাদ এবং দানার বৈশিষ্ট্যের জন্য এই চালের চাহিদা রয়েছে রাজ্যের বাইরেও। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ বিভিন্ন দেশে এই চাল রফতানি হয়। কেরলেও গোবিন্দভোগের চাহিদা রয়েছে। ফলে স্থানীয় বাজারের চেয়ে বাইরের বাজারই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই ধানের ক্ষেত্রে।
কিন্তু সেই বাজারেই এখন তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। চাল ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, গোবিন্দভোগের নামে নিম্নমানের বা দেখতে একই রকম অন্য ধানের চাল মিশিয়ে রফতানির অভিযোগ উঠেছে। মালদহ এবং উত্তরবঙ্গের কয়েকটি এলাকায় গোবিন্দভোগের মতো দেখতে ধান চাষ হচ্ছে। সেই ধানের চালের সঙ্গে দক্ষিণ দামোদরের আসল গোবিন্দভোগ মিশিয়ে বাজারজাত করার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বিদেশি বাজারে ‘গোবিন্দভোগ’ নামটির গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
তার উপর মহারাষ্ট্রে কোলাম ধানের উৎপাদন বেড়েছে। তুলনায় কম দামে পাওয়া এই চালও এখন বিদেশের বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। ফলে যে বাজার একসময় দক্ষিণ দামোদরের গোবিন্দভোগের জন্য প্রায় নির্দিষ্ট ছিল, সেখানে এখন প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
কৃষি দফতরের হিসাব বলছে, রাজ্যে প্রায় ৩৫-৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে গোবিন্দভোগ ধানের চাষ হয়। তার মধ্যে পূর্ব বর্ধমানেই প্রায় ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে এই ধান উৎপাদিত হয়। বাঁকুড়া, হুগলি, পূর্ব মেদিনীপুর-সহ আরও কয়েকটি জেলাতেও গোবিন্দভোগ চাষ হয়। দাম ভাল পাওয়ার কারণে গত কয়েক বছরে এই ধানের চাষের এলাকা বেড়েছিল। কিন্তু বাজারে দাম পড়তে থাকলে সেই উৎসাহে ভাটা আসতে পারে বলে আশঙ্কা কৃষি দফতরের।
কৃষি দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, গোবিন্দভোগের স্থানীয় বাজার খুব বড় নয়। উৎপাদনের বড় অংশই রাজ্যের বাইরে যায়। ফলে বাইরের বাজারে চাহিদা ও দাম—দুইয়ের উপরেই এই ধানের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভরশীল। মহারাষ্ট্রের কোলাম সেই জায়গা দখল করতে শুরু করলে দক্ষিণ দামোদরের চাষিদের সমস্যা বাড়বে বলেই আশঙ্কা তাঁর।
বর্তমানে ৬০ কেজি গোবিন্দভোগ ধান ৫২০০-৫৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাইসমিল মালিক কাঞ্চন সোম। তাঁর কথায়, গত বছর এই সময় দাম তুলনায় বেশি ছিল। এ বার সেই দাম না পাওয়ায় চাষিদের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই হতাশা তৈরি হয়েছে।
চাষিদের অভিযোগ, গোবিন্দভোগ চাষের খরচ কম নয়। অন্য অনেক ধানের তুলনায় এর ফলনও কম। ফলে বাজারে ভাল দাম না মিললে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে। দক্ষিণ দামোদরের চাষি অরিন্দম মণ্ডলের কথায়, ‘‘দক্ষিণ দামোদরের মতো সুগন্ধি গোবিন্দভোগ অন্য কোথাও হয় না। এক সময় বিদেশে এই চালের আলাদা কদর ছিল। কিন্তু ভেজাল মেশানোর অভিযোগে সেই সুনামই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোলাম কখনও গোবিন্দভোগের বিকল্প হতে পারে না। তবু বিদেশে সেই চাল জায়গা করে নিচ্ছে।’’
আর এক চাষি সুমন্ত চক্রবর্তীর আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী বছর গোবিন্দভোগের দাম আরও কমতে পারে। তাঁর কথায়, ‘‘এই ধানের চাষে খরচ বেশি, ফলন কম। তাই দাম না বাড়লে লোকসান হবেই। আগামী দিনে চাষিরা যদি গোবিন্দভোগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তার প্রভাব শুধু মাঠে নয়, বাজারেও পড়বে।’’
চাষিদের আশঙ্কার জায়গাটা সেখানেই। গোবিন্দভোগ শুধু একটি ধানের জাত নয়, দক্ষিণ দামোদরের কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিচিতি। বহু বছর ধরে এই ধানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চাষ, ধান কেনাবেচা, চালকল এবং রফতানির একটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক চক্র। সেই চক্রের এক প্রান্তে যদি বিদেশি বাজারে চাহিদা কমে যায়, তার অভিঘাত এসে পড়তে পারে সরাসরি মাঠে।
এক দিকে নিম্নমানের ধান মেশানোর অভিযোগে গোবিন্দভোগের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন, অন্য দিকে মহারাষ্ট্রের কোলামের বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এখন দক্ষিণ দামোদরের চাষিরা। তাঁদের দাবি, আসল গোবিন্দভোগের পরিচিতি এবং গুণমান রক্ষা না করলে শুধু চাষিরাই নয়, দীর্ঘদিনের একটি ব্র্যান্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মাঠে ধানের শিষ দুলছে ঠিকই। কিন্তু সেই শিষ ঘরে তুলে চাষির মুখে হাসি ফুটবে কি না, এখন সেই উত্তর খুঁজছে দক্ষিণ দামোদর।