একটা আগুন যেন মুহূর্তে কেড়ে নিয়েছিল উত্তরবঙ্গের বনভ্রমণের এক টুকরো ইতিহাস। সেই আগুনে শুধু একটি কাঠের বাংলো পুড়ে যায়নি, ছাই হয়ে গিয়েছিল হাজার হাজার প্রকৃতিপ্রেমীর স্মৃতি, বহু পর্যটকের স্বপ্ন, আর জলদাপাড়ার জঙ্গলের বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছিল এক অনন্য আকর্ষণ— হলং বনবাংলো। সেই শূন্যতা এবার পূরণ হতে চলেছে। প্রায় আড়াই বছর পর নতুন রূপে ফিরছে হলং।
রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসেই বনবাংলোর দরজা খুলে দেওয়া হতে পারে পর্যটকদের জন্য। বনমন্ত্রী মনোজকুমার ওরাওঁ জানিয়েছেন, নির্মাণকাজের প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ। বাকি কাজও দ্রুত এগোচ্ছে। সব কিছু ঠিক থাকলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-র হাত ধরেই উদ্বোধন হবে নতুন হলং বনবাংলোর।
হলং কেন এত বিশেষ?
ডুয়ার্সে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের কাছে হলং শুধু থাকার জায়গা নয়, বরং এক স্বপ্নের নাম। জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের গভীর অরণ্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই বনবাংলো থেকেই খুব কাছ থেকে দেখা যেত গন্ডার, হাতি, গৌর, হরিণ, ময়ূর, বুনো শুয়োর-সহ নানা বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। ভোরের কুয়াশা সরতেই বাংলোর সামনের ঘাসজমিতে গন্ডারের দল কিংবা সন্ধ্যা নামার মুখে জলাশয়ের ধারে হাতির উপস্থিতি, এই দৃশ্যই হলংকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় বনবাংলোয় পরিণত করেছিল।
বনকর্মীদের কথায়, বাংলোর বারান্দায় বসেই অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত পর্যটকদের। জঙ্গলে সাফারি না করেও বন্যপ্রাণী দেখার এমন সুযোগ দেশের খুব কম বনবাংলোতেই রয়েছে। শুধু পর্যটক নন, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু-ও পুজোর ছুটিতে একাধিকবার হলংয়ে থেকেছেন। বন দফতরের বহু অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক ও কর্মীর কাছেও এই বাংলো শুধুই একটি সরকারি ভবন নয়, তাঁদের কর্মজীবনের আবেগঘন স্মৃতি।
এক রাতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল ইতিহাস
২০২৪ সালের ১৮ জুন। বাইরে তখন টানা বর্ষণ। আচমকাই আগুন লাগে হলং বনবাংলোয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা কাঠের ভবনে। দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে উত্তরবঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বনবাংলো। বনকর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত চোখের সামনে ভস্মীভূত হয়ে যায় বাংলোটি।
প্রাথমিক তদন্তে বন দফতরের অনুমান ছিল, শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। যেহেতু পুরো বাংলোটিই প্রায় কাঠ, প্লাইউড এবং অন্যান্য দাহ্য উপাদানে তৈরি ছিল, তাই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঘটনার ছবি ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক মাধ্যমে শোকের আবহ তৈরি হয়েছিল। দেশ-বিদেশের বহু প্রকৃতিপ্রেমী হলংকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছিলেন।
পুরনো আদল, কিন্তু আরও নিরাপদ
আগুনের ঘটনার পর বন দফতর সিদ্ধান্ত নেয়, হলংকে ফিরিয়ে আনা হবে, তবে আগের ভুল আর করা হবে না।
তাই নতুন ভবনটি বাইরে থেকে প্রায় হুবহু পুরনো হলংয়ের মতোই দেখতে হবে। বাংলোর স্থাপত্য, ছাদের নকশা, বারান্দার বিন্যাস— সবই আগের আবহ বজায় রেখেই তৈরি করা হচ্ছে। তবে কাঠের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে ইট, বালি, পাথর ও কংক্রিট। ফলে আগুন লাগার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
যদিও অনেক প্রকৃতিপ্রেমীর আক্ষেপ, কাঠের বাংলোর সেই গন্ধ, সেই উষ্ণতা আর হয়তো ফিরে আসবে না। বন দফতর অবশ্য জানিয়েছে, সেই আবহ যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনতে বাংলোর ভিতরের অংশে কাঠের প্যানেলিং করা হবে। ধূপি কাঠ ব্যবহারেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপত্তায় এবার কোনও আপস নয়
পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বাংলোয় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তায়। অত্যাধুনিক ফায়ার সেফটি সিস্টেম, উন্নত বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি সতর্কীকরণ প্রযুক্তি এবং দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। যাতে ভবিষ্যতে আর কোনও দুর্ঘটনা ঘটলেও দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়।
বনমন্ত্রী মনোজকুমার ওরাওঁ বলেন, "সব দিক বিবেচনা করেই নতুন হলং বনবাংলো তৈরি হচ্ছে। নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসের মধ্যে পর্যটকদের জন্য খুলে দিতে পারব।"
খরচ প্রায় ৪ কোটি টাকা
বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, নতুন হলং বনবাংলো তৈরিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। শুধু ভবন নির্মাণ নয়, পর্যটকদের সুবিধা, নিরাপত্তা এবং আধুনিক পরিষেবার দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে চেষ্টা করা হচ্ছে, বাংলোর ঐতিহ্য ও নস্ট্যালজিয়াকে অক্ষুণ্ণ রাখতে।
ফিরবে কি সেই পুরনো হলং?
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। কারণ, হলংয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা শুধু তার কাঠের দেওয়ালের জন্য ছিল না। ছিল জঙ্গলের নিস্তব্ধতা, ভোরের আলোয় গন্ডারের হেঁটে যাওয়া, সন্ধ্যার অন্ধকারে হাতির ডাক আর অরণ্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকার এক অমূল্য অনুভূতির জন্য।
তাই নতুন কংক্রিটের দেওয়াল হয়তো পুরনো কাঠের স্মৃতিকে পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারবে না। কিন্তু যদি আবারও বাংলোর বারান্দা থেকে পর্যটকের চোখে ধরা পড়ে জলদাপাড়ার গন্ডার, যদি ভোরের কুয়াশা ভেদ করে জঙ্গলের বুক থেকে ফিরে আসে সেই চেনা ডাক, তা হলে হয়তো নতুন হলংও একদিন আবার হয়ে উঠবে উত্তরবঙ্গের বনভ্রমণের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানা। কারণ, হলং কোনও ইমারতের নাম নয়। ডুয়ার্সের অরণ্যকে খুব কাছ থেকে অনুভব করার যে বিরল অভিজ্ঞতা, তারই আর এক নাম, হলং বনবাংলো।




