ক্রিকেট মাঠ মানে ব্যাট-বলের লড়াই। হিসাবটা সেখানে রান আর উইকেটের। কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাসে ক্রিকেটের ২২ গজই হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নেপথ্যভূমি। ঘটনাটি ১৮৭৩-এর ডিসেম্বর মাসের। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের ব্যারাক স্কোয়্যারে ব্রিটিশ সেনাদের ক্রিকেট চলছিল।
আর ঠিক সেই সময়ই পালকিতে সেই মাঠের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলার তৎকালীন ডেপুটি কালেক্টর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এর ফলে খেলা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগে ব্রিটিশ আধিকারিক কর্নেল ডাফিনের সঙ্গে তাঁর বিবাদ, এবং তার পরের অপমান—ঘটনাগুলি নিছক ব্যক্তিগত সংঘাত হয়ে থাকেনি। বরং ঔপনিবেশিক ক্ষমতার সামনে এক ভারতীয় সরকারি আধিকারিকের মাথা নত না করার কাহিনি হয়ে উঠেছিল তা।
সম্মানীয় ডেপুটি কালেক্টর বঙ্কিমচন্দ্রকে পালকি থেকে কার্যত টেনে নামিয়েই জনসমক্ষে চূড়ান্ত অপমান করেছিলেন কর্নেল ডাফিন। সেই অপমানে লাল হয়ে পরের দিনই ডাফিনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন বঙ্কিমচন্দ্র। এর পর ব্রিটিশ আধিকারিকদের একাংশ ঘটনার কথা অস্বীকার করলেও তাঁর পাশে দাঁড়ান কয়েকজন বিশিষ্ট সাক্ষী। যদিও শেষ পর্যন্ত আপসের শর্তে মামলা প্রত্যাহারে রাজি হন বঙ্কিমচন্দ্র। তবে শর্ত একটাই। প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে ডাফিনকে।
আদালতে সেই ক্ষমাপ্রার্থনার দৃশ্য নিঃসন্দেহে ঔপনিবেশিক দম্ভের বিরুদ্ধে বিরল প্রতীকী জয়। কিন্তু এর পরেই পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রের আশঙ্কায় লালগোলার রাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়ের পরামর্শে তিনি বহরমপুর ছাড়েন। ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায় যেন সেই ক্রিকেট মাঠের অপমানকেই অন্য এক সুরে ফিরিয়ে দিল।
লালগোলার নির্জনতায় বঙ্কিমচন্দ্রের মনে জন্ম নেয় এমন এক ভাবনা, যা পরে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়। মাতৃভূমিকে কেন্দ্র করে একটি সর্বভারতীয় চেতনার ভাষা খুঁজছিলেন তিনি। সেই ভাবনারই ফল ‘বন্দে মাতরম’।
পরে তাঁর উপন্যাস আনন্দমঠ-এ গানটি স্থান পায় এবং সাহিত্যকে ছাপিয়ে তা হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মন্ত্র। শ্রীঅরবিন্দের মতো জাতীয়তাবাদী চিন্তকদের ব্যাখ্যায় ‘বন্দে মাতরম’ কেবল দেশপ্রেমের গান নয়, ছিল আত্মজাগরণের আহ্বানও।
উনিশ শতকের শেষভাগে গানটির বিস্তার আরও দ্রুত হয়। ১৮৯৬ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করেন। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের সভা, মিছিল, রাজনৈতিক সমাবেশে এই ধ্বনি ব্রিটিশ-বিরোধী প্রতিবাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি হয়ে যায়।
অর্থাৎ একটি ক্রিকেট ম্যাচ ঘিরে যে সংঘাতের সূত্রপাত, তার বহু দূরের প্রতিধ্বনি শোনা গেল জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে। মাঠের মাটি থেকে উঠে আসা সেই অপমান যেন ক্রমে পরিণত হল আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার দাবিতে।
ইতিহাসের এই কাহিনির সবচেয়ে তাৎপর্য এখানেই। ‘বন্দে মাতরম’-এর জন্মকে শুধু একটি গানের রচনাকাল দিয়ে বিচার করলে গল্পটির গভীরতা ধরা পড়ে না। বহরমপুরের ক্রিকেট মাঠে ঔপনিবেশিক দম্ভের মুখোমুখি বঙ্কিমচন্দ্রের অবস্থান, লালগোলায় তাঁর পরবর্তী সৃজনচিন্তা এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’-এর বিস্তার—সব মিলিয়ে এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক অনন্য সাংস্কৃতিক যাত্রা। ব্রিটিশদের খেলার সেই মাঠ হয়তো জানত না, তারই ধুলোয় একদিন বপন করা হবে ইতিহাসের বীজ। আর সেই বীজ থেকেই জন্ম নেবে এমন এক উচ্চারণ, যা প্রকট হবে সমগ্র পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা-আকাঙ্ক্ষার কণ্ঠ হয়ে।