কলকাতা: সকালে ডিমের ঝোল, দুপুরে মুরগির মাংস কিংবা রাতের খাবারে ডিমভাত! মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আমিষের এই পদগুলি দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। কিন্তু সেই পরিচিত খাবারই এ বার আরও দামি হয়ে উঠতে পারে। পোলট্রি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের খরচ লাগামছাড়া ভাবে বেড়ে যাওয়ায় ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ডিম ও মুরগির দাম ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্পকর্তারা।
এক দিকে ভুট্টা ও ভাঙা চালের দাম বৃদ্ধি, অন্য দিকে দুর্বল বর্ষার কারণে খরিফ মরসুমে উৎপাদন কমার আশঙ্কা। তার সঙ্গে ভুট্টার চাহিদা বাড়িয়েছে ইথানল শিল্প। সব মিলিয়ে পোলট্রি খাবারের জোগান ও দাম- দুই ক্ষেত্রেই তৈরি হয়েছে চাপ। তার প্রভাব পড়তে পারে বছরের শেষের উৎসবের মরসুমে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।
শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে পোলট্রি খাবারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলির দাম প্রায় ৩০-৪৫ শতাংশ বেড়েছে। ফলে মুরগি পালন থেকে ডিম উৎপাদন- সব ক্ষেত্রেই খরচের বোঝা বাড়ছে। সেই বাড়তি খরচের কতটা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের উপর চাপানো হবে, তা নিয়ে অবশ্য সংশয় রয়েছে। কারণ, দাম বাড়লে চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন উৎপাদকরা।
ভুট্টার দাম এক বছরে ১৮ টাকা থেকে ৩৪ টাকা
পোলট্রি শিল্পে ভুট্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগির খাবারে ভুট্টার পরিমাণ মোট ওজনের প্রায় ৫৫-৬৫ শতাংশ। ফলে ভুট্টার বাজারদর বাড়লে সরাসরি তার প্রভাব পড়ে মুরগি পালনের খরচে। শিল্পমহলের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত বছর ভুট্টার দাম ছিল কেজিতে প্রায় ১৮ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৩৪ টাকা। মাত্র এক মাস আগেও ভুট্টার দাম ছিল কেজিতে ২৬-২৭ টাকা।
অর্থাৎ, অল্প সময়ের মধ্যেই দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। শিল্পকর্তাদের আশঙ্কা, সরবরাহের উপর চাপ অব্যাহত থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে ভুট্টার দাম কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এই আশঙ্কার পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভুট্টা উৎপাদনকারী রাজ্যে দুর্বল বর্ষার কারণে খরিফ মরসুমে উৎপাদন কমতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। শিল্পমহলের হিসাব, এ বার দেশে খরিফ ভুট্টার উৎপাদন ১৫-১৬ শতাংশ কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাজারে জোগান কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তার উপর ভুট্টার চাহিদা শুধু পোলট্রি শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইথানল তৈরির জন্যও ভুট্টার ব্যবহার বাড়ছে। জ্বালানি উৎপাদনের এই চাহিদা খাদ্য ও পশুখাদ্য শিল্পের সঙ্গে একই শস্যের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। ফলে পোলট্রি খাবারের জন্য ভুট্টা সংগ্রহ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। শিল্পমহলের আরও অভিযোগ, দাম বাড়ার আশায় সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যবর্তী স্তরে কিছু ব্যবসায়ী ভুট্টা মজুত করে রাখছেন। এর ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক জোগান আরও কমে যেতে পারে। তবে মজুতদারির অভিযোগের প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভাঙা চালের দামও দ্বিগুণের কাছাকাছি
পোলট্রি খাবারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ভাঙা চাল। ভুট্টার পাশাপাশি এই শস্যের দামও দ্রুত বেড়েছে।
বাজারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ভাঙা চালের দাম ছিল কেজিতে ১৪-১৫ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৩১-৩২ টাকা। এক মাস আগেও দাম ছিল ২২-২৩ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ভাঙা চালের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
ভুট্টা ও ভাঙা চালের এই মূল্যবৃদ্ধি পোলট্রি শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে এই দুই শস্যের দাম বেড়ে গেলে বিকল্প হিসেবে জোয়ার, বাজরা বা রাগির মতো খাদ্যশস্য ব্যবহার করতেন পোলট্রি উৎপাদকরা। কিন্তু এখন সেই বিকল্পগুলির দামও বেড়েছে।
ভেঙ্কটেশ্বর হ্যাচারিজ়ের জেনারেল ম্যানেজার কে জি আনন্দের বক্তব্য, আগে ভুট্টা ও চালের দাম বাড়লে অন্য শস্যের দিকে সরে যাওয়ার সুযোগ ছিল। এখন সেই বিকল্পগুলিও সস্তা নেই। ফলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডিসেম্বরে ডিমের দাম ৮ টাকা, মুরগি কেজিতে ২৭৫?
পোলট্রি খাবারের দাম বাড়ার প্রভাব আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে পড়তে পারে বলে মনে করছেন শিল্পকর্তারা।
বর্তমানে ডিমের পাইকারি দাম প্রতি পিস প্রায় ৬-৭ টাকা। ডিসেম্বরের মধ্যে তা বেড়ে ৭-৮ টাকা হতে পারে বলে অনুমান। একই ভাবে চামড়া ছাড়ানো মুরগির পাইকারি দাম বর্তমানে কেজিতে ২২৫-২৫০ টাকা। তা বেড়ে ২৬০-২৭৫ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা।
তবে এই দামবৃদ্ধির পূর্বাভাস মূলত শিল্পমহলের অনুমানের উপর নির্ভরশীল। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লেই খুচরো বাজারে একই হারে দাম বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিবহণ খরচ, স্থানীয় চাহিদা, ব্যবসায়ীদের মুনাফা এবং সরবরাহের পরিস্থিতির উপর খুচরো দাম নির্ভর করবে।
উৎপাদকদের বক্তব্য, পোলট্রি খাবারের খরচ যতটা বেড়েছে, তার পুরোটা ক্রেতাদের উপর চাপানো সম্ভব নয়। কারণ, ডিম ও মুরগির দাম বেশি হলে সাধারণ মানুষ কেনাকাটা কমিয়ে দিতে পারেন। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও বিক্রির দাম সেই অনুপাতে বাড়ানো যাচ্ছে না।
শীতের চাহিদা বাড়বে, উৎপাদন কমার আশঙ্কা
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি সাধারণত পোলট্রি শিল্পের ব্যস্ততম সময়। বড়দিন ও নতুন বছরের উৎসবকে কেন্দ্র করে ডিম ও মুরগির চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এ বার সেই সময়েই উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিল্পকর্তাদের অনুমান, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে পোলট্রি উৎপাদন ২০ শতাংশেরও বেশি কমতে পারে। খাবারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় মুরগি পালনকারীদের একাংশ কম বয়সেই মুরগি বিক্রি করে দিতে পারেন।
এতে খাবারের খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব হলেও বাজারে সরবরাহের উপর প্রভাব পড়তে পারে। ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে খাবারের খরচ উৎপাদনের অন্যতম বড় অংশ। ফলে খাবারের দাম বাড়লে মুরগিকে বাজারে বিক্রির উপযুক্ত ওজন পর্যন্ত বড় করে তোলার খরচও বেড়ে যায়। উৎপাদকদের সামনে তখন দু'টি পথ—বাড়তি খরচ বহন করা, অথবা কম সময় মুরগি পালন করে দ্রুত বিক্রি করে দেওয়া। দ্বিতীয় পথ বেছে নেওয়া হলে মুরগির উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহের উপর চাপ তৈরি হতে পারে।
শুধু পোলট্রি নয়, খাদ্যদ্রব্যের দামেও চাপ
ডিম ও মুরগির দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের খাদ্যদ্রব্যের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ রয়েছে। দুর্বল বর্ষার কারণে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুট্টা, চাল, ডাল, গম এবং অন্যান্য খাদ্যশস্যের জোগান ও দাম নিয়ে নতুন করে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পোলট্রি শিল্পের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। কারণ, এখানে খাদ্যশস্য সরাসরি মানুষের খাবার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, আবার পশুখাদ্য ও জ্বালানি উৎপাদনের জন্যও প্রয়োজন হয়। ফলে একই শস্যের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের চাহিদা বাড়লে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুট্টার উৎপাদন, বাজারে সরবরাহ এবং ইথানল শিল্পের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। একই সঙ্গে পোলট্রি খাবারের বিকল্প উপাদানগুলির জোগান বাড়ানো গেলে উৎপাদকদের উপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে আপাতত শিল্পমহলের আশঙ্কা, খাবারের খরচ বৃদ্ধির ধাক্কা ডিসেম্বরের বাজারে পড়তে পারে। ডিমের পাইকারি দাম ৭-৮ টাকা এবং চামড়া ছাড়ানো মুরগির দাম কেজিতে ২৬০-২৭৫ টাকায় পৌঁছলে তার প্রভাব খুচরো বাজারেও পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বছরের শেষের উৎসবের মরসুমে ডিম ও মুরগির চাহিদা বাড়ার কথা। কিন্তু সেই সময়েই উৎপাদন কমে গেলে এবং খাবারের খরচ আরও বাড়লে আমিষের বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। এখন নজর ভুট্টা ও ভাঙা চালের দামের দিকে। সেই সঙ্গে খরিফ ফসলের উৎপাদন এবং বাজারে জোগান কতটা স্বাভাবিক থাকে, তার উপর নির্ভর করবে ডিসেম্বরের ডিম-মুরগির দামের অঙ্ক।




