নয়াদিল্লি: ভারত-ব্রিটেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। ব্রিটেন থেকে আমদানি করা স্কচ হুইস্কির উপর শুল্ক ছাড়ের সুবিধা আদৌ সব ধরনের আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা খতিয়ে দেখছে ভারতের রাজস্ব দফতর। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণে আমদানি করা ‘বাল্ক স্কচ’ বা বড় পাত্রে আনা হুইস্কির শ্রেণিবিভাগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তদন্তকারীরা। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপে উদ্বেগ বেড়েছে ডিয়াজিও, পেরনো রিকার্ডের মতো বহুজাতিক সংস্থার পাশাপাশি দেশীয় মদ প্রস্তুতকারকদেরও। কারণ, এই আমদানি-শুল্কের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের কয়েক হাজার কোটি টাকার মদ শিল্প, দেশীয় উৎপাদন এবং সদ্য কার্যকর হওয়া ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ।
কী নিয়ে বিতর্ক?
ভারত-ব্রিটেন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) গত ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল ব্রিটেন থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট কিছু স্কচ হুইস্কির উপর শুল্ক কমানো। আগে এই ধরনের আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কের হার ছিল ১৫০ শতাংশ। চুক্তি অনুযায়ী, তা প্রথম ধাপে কমিয়ে ৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। আগামী ১০ বছরে ধাপে ধাপে তা আরও কমে ৪০ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কিন্তু এই শুল্কছাড়ের সুবিধা বাল্ক স্কচ আমদানির ক্ষেত্রেও পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে জটিলতা। ভারতীয় তদন্তকারীদের বক্তব্য, বড় পাত্রে আমদানি করা কিছু স্কচ হুইস্কিকে কম শুল্কের আওতায় আনা যায় না। সেগুলিকে ‘বেভারেজ তৈরিতে ব্যবহৃত কম্পাউন্ড অ্যালকোহলিক প্রিপারেশন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে পুরনো ১৫০ শতাংশ শুল্কই প্রযোজ্য হবে।
অন্যদিকে, মদ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির দাবি, বাল্ক স্কচ কোনও সাধারণ অ্যালকোহল মিশ্রণ বা ফ্লেভারযুক্ত পানীয়ের উপাদান নয়। এটি বার্লি থেকে তৈরি প্রকৃত ডিস্টিলড স্কচ হুইস্কি। ফলে ভারত-ব্রিটেন চুক্তিতে হুইস্কি আমদানির জন্য যে শুল্কছাড়ের কথা বলা হয়েছে, তার আওতায় বাল্ক স্কচকেও রাখা উচিত।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাল্ক স্কচ?
ভারতের মদ শিল্পের কাছে এই বিতর্কের গুরুত্ব যথেষ্ট বেশি। ব্রিটেন থেকে ভারতে আসা স্কচ হুইস্কির প্রায় ৮০ শতাংশই আসে বাল্ক আকারে। পরে সেই হুইস্কি ভারতীয় সংস্থাগুলি নিজেদের কারখানায় অন্যান্য উপাদান ও দেশীয় স্পিরিটের সঙ্গে মিশিয়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পানীয় তৈরি করে। ভারতে তৈরি বিদেশি মদ বা ‘ইন্ডিয়ান মেড ফরেন লিকার’ (আইএমএফএল) শিল্পের একটি বড় অংশ এই আমদানিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পেরনো রিকার্ডের ‘ব্লেন্ডার্স প্রাইড’-এর মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডে ভারতীয় গ্রেন স্পিরিটের সঙ্গে আমদানি করা স্কচ মল্ট ব্যবহার করা হয়। একই ভাবে ডিয়াজিও এবং একাধিক দেশীয় সংস্থাও তাদের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্য বিদেশ থেকে বাল্ক স্কচ আমদানি করে। ফলে বাল্ক স্কচের উপর শুল্ক যদি ফের ১৫০ শতাংশ করা হয়, তা হলে দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত বহু জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে সংস্থাগুলির মুনাফা, পণ্যের দাম এবং বাজারের প্রতিযোগিতায়।
তদন্তের আওতায় ডিয়াজিও, পেরনো রিকার্ড
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় দুই মদ প্রস্তুতকারক সংস্থা- ব্রিটিশ বহুজাতিক ডিয়াজিও এবং ফরাসি সংস্থা পেরনো রিকার্ড। ভারতের রাজস্ব গোয়েন্দা দফতর (ডিআরআই) ইতিমধ্যেই সংস্থাগুলির আমদানি সংক্রান্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখেছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, বাল্ক স্কচ আমদানির ক্ষেত্রে সংস্থাগুলি সঠিক শুল্ক-শ্রেণিবিভাগ করেছিল কি না। গত অক্টোবরে পেরনো রিকার্ডের দিল্লির দফতরে গিয়ে আধিকারিকেরা সংস্থার কর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আমদানি সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করেন।
ডিয়াজিওর ভারতীয় শাখা ইউনাইটেড স্পিরিটসও জানিয়েছে, তাদের একাধিক দফতরে তদন্তকারী সংস্থার তল্লাশি হয়েছে। পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের রাজ্য কর দফতরও সংস্থাটির দফতরে তল্লাশি চালিয়েছে। তবে দুই সংস্থাই জানিয়েছে, তারা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে এবং দেশের আইন মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করে। ইউনাইটেড স্পিরিটসের তরফে জানানো হয়েছে, তদন্তের কারণে তাদের ব্যবসায়িক বা আর্থিক কাজকর্মে কোনও প্রভাব পড়েনি।
দেশীয় সংস্থাগুলিও কেন উদ্বিগ্ন?
প্রথমে মনে হতে পারে, এই বিতর্ক মূলত বিদেশি সংস্থাগুলির স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বাস্তবে দেশীয় মদ প্রস্তুতকারকরাও একই ভাবে উদ্বিগ্ন। কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান অ্যালকোহলিক বেভারেজ কোম্পানিজ (সিআইএবিসি) কেন্দ্রকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, বাল্ক স্কচের ক্ষেত্রে শুল্কছাড় না মিললে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংস্থাটির যুক্তি, বাল্ক স্কচ আমদানিতে বেশি শুল্ক চাপানো হলে ভারতীয় কারখানায় তৈরি মদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। অন্য দিকে, বিদেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি বোতলবন্দি হুইস্কি আমদানি তুলনামূলক ভাবে বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে। তাতে দেশীয় উৎপাদনের বদলে তৈরি পণ্য আমদানির প্রবণতা বাড়বে। যা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই মনে করছে শিল্পমহল।
এই সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে রয়েছে রেডিকো খৈতান এবং অ্যালাইড ব্লেন্ডার্স অ্যান্ড ডিস্টিলার্সের মতো বড় দেশীয় সংস্থা। অ্যালাইড ব্লেন্ডার্স তাদের বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকাশিত নথিতে জানিয়েছে, তারা দেশের অন্যতম বৃহৎ বাল্ক স্কচ আমদানিকারক। ভারত-ব্রিটেন চুক্তির ফলে তাদের বিলাসবহুল পানীয়ের ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
ব্রিটেনেরও চাপ, আলোচনায় স্কটল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী
বিতর্ক শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ শিল্পেই সীমাবদ্ধ নেই। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিটেনও। ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বাণিজ্যচুক্তিতে যে শুল্কছাড়ের বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছিল, তার সুবিধা যাতে ব্রিটিশ সংস্থাগুলি পায়, তা নিশ্চিত করতে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সম্প্রতি ভারত সফরে এসে স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনিও বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। ২০ থেকে ২৭ অক্টোবরের সফরে তিনি বাল্ক স্কচ আমদানির উপর শুল্কের বিষয়টি উত্থাপন করেন। স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতে হুইস্কি শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভারতের মতো বিশাল বাজারে শুল্ক সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ব্রিটিশ ও স্কটিশ উৎপাদকদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের বাজার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বে স্কচ হুইস্কির সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার ভারত। স্কচ হুইস্কি অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্রিটেন থেকে ভারতে ২২ কোটিরও বেশি বোতলের সমপরিমাণ স্কচ রফতানি হয়েছিল। ভারতের প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের মদ শিল্পে বিদেশি ও দেশীয় সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক স্বার্থও বিপুল। এই বাজারে শুল্কের সামান্য পরিবর্তনও সংস্থাগুলির উৎপাদন খরচ ও মুনাফায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে স্কচ-ভিত্তিক পানীয় তৈরি করার ক্ষেত্রে বাল্ক স্কচের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সমাধানের পথ কোন দিকে?
বিতর্কের জেরে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের আধিকারিকদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি মদ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখানে বাল্ক স্কচের শুল্ক-শ্রেণিবিভাগ এবং ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্যচুক্তির শর্ত কী ভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। শিল্পমহল চাইছে, কেন্দ্র দ্রুত বিষয়টি স্পষ্ট করুক, যাতে আমদানি ও উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা না থাকে।
সব মিলিয়ে, স্কচ হুইস্কির শুল্ক নিয়ে এই বিরোধ ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্যচুক্তির প্রথম বড় পরীক্ষাগুলির একটি হয়ে উঠেছে। এক দিকে রাজস্ব আদায় ও শুল্কবিধি কার্যকর করার প্রশ্ন, অন্য দিকে দেশীয় উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির প্রতিশ্রুতি, দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে কেন্দ্রকে। শেষ পর্যন্ত বাল্ক স্কচের উপর কত শুল্ক ধার্য হবে, তার উপরই নির্ভর করতে পারে ভারতের মদ শিল্পের বড় একটি অংশের ভবিষ্যৎ।




