নিউজ ডেস্ক: প্রায় দু'শো বছর আগে জমি ও সোনার লোভে উত্তর জর্জিয়ার আদি আমেরিকান বাসিন্দা চেরোকি জনগোষ্ঠীকে তাঁদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করেছিলেন শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়রা। সেই জমিতেই এখন নতুন করে বসতি গড়ছেন অন্য এক ভারতীয় জনগোষ্ঠী। তেলুগু, হিন্দি, তামিল ভাষাভাষী ভারতীয়রা হাজারে হাজারে এসে বসবাস করছেন আমেরিকার জর্জিয়া প্রদেশের ফোরসাইথ কাউন্টিতে। কিনছেন কয়েক লক্ষ থেকে শুরু করে ১৫ লক্ষ ডলারের বিলাসবহুল বাড়ি। তৈরি হচ্ছে ছোট ছোট ভারতীয় জনপদ। কিন্তু স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের সঙ্গে তাঁদের সামাজিক মেলামেশা এবং সাংস্কৃতিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।
স্থানীয় সমাজকর্মী ও সম্প্রদায়ের নেতাদের বক্তব্য, ভারতীয় অভিবাসীদের একটা বড় অংশ নিজেদের গণ্ডির মধ্যেই থাকতে পছন্দ করেন। সামাজিক ভাবে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের সঙ্গে তাঁদের মেলামেশা তুলনায় কম। এর ফলে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অভিবাসীবিরোধী মনোভাবও বেড়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
জর্জিয়ায় ভারতীয়দের আগমন শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। মূলত এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জর্জিয়া টেকের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা বা গবেষণার জন্য এসেছিলেন তাঁরা। ২০০০ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ফোরসাইথ কাউন্টিতে তখন ভারতীয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬০। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫২ হাজার। কাউন্টির মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ এখন ভারতীয়। ৬৩.৫ শতাংশ শ্বেতাঙ্গদের পর তাঁরাই দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী।
ইউএসএ ইন্ডিয়া বিজনেস সামিটের প্রোগ্রাম চেয়ারম্যান আনি অগ্নিহোত্রী জানিয়েছেন, নতুন ভারতীয় অভিবাসীদের কাছে ফোরসাইথ অত্যন্ত পছন্দের জায়গা। কারণ এখানে আগে থেকেই ভারতীয়দের বসবাস রয়েছে। রয়েছে ভারতীয় দোকান, মন্দির, ভাল স্কুল এবং নতুনদের সাহায্য করার মতো পরিচিত মানুষ। ভারতীয়দের গড় বার্ষিক আয় প্রায় দেড় লক্ষ ডলার, যা গড় মার্কিন আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁর মতে, এই আর্থিক সাফল্যও স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠছে।
১৯৯১ সালে এমবিএ পড়তে জর্জিয়ায় এসেছিলেন অগ্নিহোত্রী। তাঁর কথায়, ‘‘ভারতীয়রা আমেরিকায় এসে বড় বাড়ি, বড় গাড়ি, ভাল উপার্জন, মন্দির এবং সন্তানদের আইভি লিগ কলেজে পড়ানোর স্বপ্ন দেখেন।’’ তবে এই সমৃদ্ধির পিছনে থাকা এলাকার অতীতও কম অন্ধকার নয়। এক সময় ফোরসাইথ ছিল বর্ণবিদ্বেষের অন্যতম ভয়াবহ কেন্দ্র। উনিশ শতকে চেরোকি জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের পর বিংশ শতকের গোড়ায় কৃষ্ণাঙ্গদের উপর নেমে এসেছিল ভয়াবহ অত্যাচার।
১৯১২ সালে কামিং শহরে ১৮ বছরের এক শ্বেতাঙ্গ তরুণী মে ক্রোর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর রব এডওয়ার্ডস নামে এক কৃষ্ণাঙ্গকে জেল থেকে টেনে বার করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর দেহ টেলিগ্রাফের খুঁটিতে ঝুলিয়ে রেখে গুলি ও অস্ত্র দিয়ে বিকৃত করা হয়েছিল। পরে আরও দু'জন কৃষ্ণাঙ্গকে একতরফা বিচারের পর ফাঁসি দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা এলাকার সমস্ত কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করে। দীর্ঘ কয়েক দশক ফোরসাইথ কার্যত শ্বেতাঙ্গদের একচেটিয়া এলাকায় পরিণত হয়েছিল।
এরও আগে ১৮২৮ সালে জর্জিয়ায় সোনা আবিষ্কারের পর চেরোকিদের জমি থেকে জোর করে সরিয়ে ওকলাহোমার সংরক্ষিত এলাকায় পাঠানো হয়। আমেরিকার ইতিহাসে এই উচ্ছেদ ‘ট্রেল অফ টিয়ার্স’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ভেনু চেল্লা মনে করেন, নতুন ভারতীয়দের এই ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তাঁর কথায়, ‘‘যে জমিতে নতুন জীবন গড়তে চাইছেন, সেই জমির অতীত জানা জরুরি। তা বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে এবং নিজেদের আচরণ ঠিক করতে সাহায্য করে।’’
তবে দ্বিতীয় প্রজন্মের ভারতীয়-আমেরিকানদের মধ্যে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। সাম্প্রতিক কাউন্টি কমিশনার নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হয়েছিলেন দ্বিতীয় প্রজন্মের ভারতীয়-আমেরিকান সুচিতা প্যাটেল। তিনি অল্প ব্যবধানে হেরে গেলেও তাঁর প্রার্থিপদকেই স্থানীয় সমাজে ভারতীয়দের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৮৭ সালেও ফোরসাইথে নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারীদের শান্তি মিছিল শ্বেতাঙ্গদের হিংসার মুখে পড়েছিল। সেই এলাকার ছবিই এখন বদলাচ্ছে। প্রকাশ্য বর্ণবিদ্বেষ অনেকটাই কমেছে। কিন্তু স্থানীয় সমাজের সঙ্গে ভারতীয় অভিবাসীদের প্রকৃত সামাজিক সমন্বয় এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।




