সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আমেরিকার চাকরি, ঝকঝকে জীবনযাপন, উঁচু বেতন আর আধুনিক জীবনযাত্রার ছবি দেখে অনেকেই বিদেশে বসবাসের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কঠিন বাস্তবের কথা কতটা জানা আছে? সেই প্রশ্নই যেন সামনে এনে দিলেন আমেরিকাপ্রবাসী এক ভারতীয় তরুণী। তাঁর একটি ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল।
সেখানে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, "আমেরিকায় এসে কেউ 'প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট' বা রাজকন্যার মতো যত্ন পাওয়ার আশা করবেন না।" আর সেই মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। ভিডিওতে ওই তরুণী বলেন, বিশেষ করে ভারত থেকে যাঁরা আমেরিকায় যেতে চান, তাঁদের অনেকের মধ্যেই বিদেশের জীবন নিয়ে এক ধরনের রোম্যান্টিক ধারণা কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে প্রতিদিনের জীবন অনেক বেশি পরিশ্রমের। ভারতে পরিবার, গৃহকর্মী বা আত্মীয়স্বজনের সাহায্য পাওয়া গেলেও আমেরিকায় প্রায় সব কাজই নিজের হাতে করতে হয়।
'অফিস শেষে শুরু হয় দ্বিতীয় শিফট'
তরুণীর কথায়, আমেরিকায় কর্মজীবন শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরার পর শুরু হয় দিনের দ্বিতীয় পর্ব। বাজার করা, রান্না, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘর পরিষ্কার, আবর্জনা ফেলা— সবটাই নিজেকেই করতে হয়। অনেক সময় সপ্তাহান্তও কেটে যায় শুধু সংসারের কাজ সামলাতে। তিনি বলেন, "এখানে এমন কেউ নেই যে আপনার জন্য সব কিছু গুছিয়ে রাখবে। নিজের জীবন নিজেকেই চালাতে হবে।"
জল কিনতেও খরচ, শুষ্ক আবহাওয়ায় নতুন সমস্যা
ভিডিওতে তিনি আরও দাবি করেন, তাঁদের এলাকায় কলের জল পান করতে স্বস্তি না পাওয়ায় প্রতি কয়েক দিন অন্তর প্রায় ৩.৫ ডলার খরচ করে বড় বোতলের জল কিনতে হয়। সেই ভারী জলের বোতল বহন করাও যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এছাড়া আমেরিকার অনেক জায়গার শুষ্ক আবহাওয়ায় ত্বক ও চুলের নানা সমস্যার মুখোমুখিও হতে হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে শুধুমাত্র উচ্চ বেতন দেখলেই বিদেশের জীবনকে সহজ মনে করা ঠিক নয় বলেই তাঁর মত।
'ডলারে বেতন, কিন্তু খরচও ডলারে'।
তরুণী আরও বলেন, অনেকেই মনে করেন আমেরিকায় গেলেই মোটা অঙ্কের বেতন পাওয়া যায়। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্যবিমা, যাতায়াত, বিদ্যুৎ, খাবার, কর-সহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয় অনেক বেশি। ফলে আয় যতটা বেশি, খরচের চাপও কম নয়। বিদেশে স্বাধীন জীবনযাপনের অর্থ হল প্রতিটি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া। সমর্থন যেমন, তেমনই সমালোচনাও। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নেটমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই তরুণীর বক্তব্যকে বাস্তবসম্মত বলে সমর্থন করেছেন। তাঁদের মতে, বিদেশে বসবাসের চকচকে দিক যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, একাকীত্ব এবং আত্মনির্ভরতার বাস্তবতা। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে এই বিষয়গুলি জানা জরুরি।
তবে সমালোচনাও কম হয়নি।
বহু নেটিজেন দাবি করেন, আমেরিকার অধিকাংশ শহরেই কলের জল নিরাপদ এবং পানযোগ্য। অনেকে লিখেছেন, বোতলের জল নিয়মিত কেনার প্রয়োজন হয় না; চাইলে বাড়িতে ফিল্টার ব্যবহার করেই নিরাপদ জল পান করা যায়। আবার কেউ কেউ বলেন, আমেরিকার অভিজ্ঞতা রাজ্যভেদে এবং শহরভেদে আলাদা হতে পারে। তাই একজনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে গোটা দেশের বাস্তবতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
একটি ভিডিও, কিন্তু নতুন বিতর্কের সূত্রপাত
মাত্র কয়েক মিনিটের এই ভিডিও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— বিদেশে বসবাসের স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে ব্যবধান কতটা? সোশ্যাল মিডিয়ায় যেখানে বিদেশের চাকরি ও জীবনযাপনের সাফল্যের গল্পই বেশি জায়গা পায়, সেখানে এই ভারতীয় তরুণীর বক্তব্য অনেকের কাছে 'রিয়্যালিটি চেক' হিসেবেই ধরা দিয়েছে। আবার অন্যদের মতে, এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ভিডিওটি আমেরিকার জীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।