কলকাতা: ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর টিকিট বা পাস বিক্রির অভিযোগকে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতা আরও বাড়ল প্রাক্তন পর্যটন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের। গ্রেফতারির আশঙ্কায় কলকাতা হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন করেছেন তিনি। বুধবার সেই মামলার শুনানিতে ইন্দ্রনীল সেনের ভূমিকা এবং তাঁর মন্ত্রী থাকাকালীন প্রভাব খাটানোর সম্ভাবনা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুললেন বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ।
ইন্দ্রনীল সেনের হয়ে আগাম জামিনের আবেদনটি প্রথমে বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের এজলাসে ওঠে। তবে তিনি অসুস্থ থাকায় বর্তমানে মামলাটির শুনানি করছেন বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। শুনানিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ, ইন্দ্রনীল যেহেতু রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন, তাই প্রশাসনিক বা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর সুযোগ তাঁর ছিল কি না, তা তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ইন্দ্রনীলের আইনজীবী জিষ্ণু সাহা আদালতে দাবি করেন, দুর্গাপুজোর প্রচার ও প্রোমোশনের কাজের সঙ্গে তাঁর মক্কেলের নাম জড়ানো হলেও বিষয়টি নিয়ে প্রতারণার কোনও অভিযোগ নেই। তিনি ইউনেস্কোর নথি এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্রও আদালতে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, ২০২৩ সালে প্রিভিউ শোয়ের জন্য বিনামূল্যে পাস দেওয়া হয়েছিল। বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্যও বিনামূল্যে পাসের ব্যবস্থা ছিল।
তবে শুনানির মাঝেই বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ প্রশ্ন করেন, “কোন ক্যাপাসিটিতে আপনারা করেছেন?” আদালতে প্রশ্ন ওঠে, ইউনেস্কোর স্বীকৃতিকে কি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যায়? প্রিভিউ শোয়ের নামে পাস বিক্রি করার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি।
রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে দাবি করেন, প্রতিটি পাসের জন্য প্রায় ১৭ হাজার টাকা থেকে ৪.৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হত। রাজ্যের বক্তব্য অনুযায়ী, এই আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এরপর মামলায় আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি ঘোষ। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অভিযোগের মধ্যে ‘মানি ফ্লো’-এর বিষয় রয়েছে। তাই তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। ইন্দ্রনীল সেনের অ্যাকাউন্টে কোনও টাকা সরাসরি গিয়েছিল কি না, তাও জানতে চান তিনি।
ইন্দ্রনীলের আইনজীবী অবশ্য দাবি করেন, ইডি ইতিমধ্যেই ১৯টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে, কিন্তু তাঁর মক্কেলের কাছ থেকে কোনও টাকা উদ্ধার করতে পারেনি। এমনকী তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেও অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও টাকা নেই বলে আদালতে দাবি করা হয়।
তবে এখানেই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটি তোলেন বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ ইন্দ্রনীল সেন তৎকালীন রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন। তাহলে তিনি কি কোনও বাড়তি সুবিধা পাননি? টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তাঁর কোনও প্রভাব ছিল না, তা আদালত কীভাবে নিশ্চিত হবে সেই প্রশ্নও তোলেন বিচারপতি।
ইন্দ্রনীলের আইনজীবী পাল্টা দাবি করেন, ‘মাসআর্ট’ নামে তাঁর স্ত্রীর সংস্থা আগেও একাধিক কাজ ও টেন্ডার পেয়েছে এবং মন্ত্রী হওয়ার আগেও ওই সংস্থা ব্যবসা করত। তাঁর বক্তব্য, প্রায় ৪০টি টেন্ডার নেওয়ার বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত আদালত রাজ্যকে আর্থিক লেনদেনের ‘ফ্লো চার্ট’ জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আগামী শুক্রবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি। ফলে সেদিন আদালতে রাজ্যের দেওয়া তথ্য এবং ইন্দ্রনীল সেনের আগাম জামিনের আবেদনের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
