নিউজ ডেস্ক: বাংলার আধুনিক নবজাগরণের যে অন্যতম অগ্রদূত ও সংস্কারক এই সমাজের অচলায়তন ভেঙে এক আপসহীন জীবনের উদাহরণ রেখে গেছেন তাঁর নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আজ তাঁর ২০৬তম জন্মদিন। যে-জীবন দু’শো বছর পেরিয়ে আজও অনন্য এবং যার চারিত্রিক গুণ আজও আমাদের সমাজে বিরল তাঁর সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,- ‘পল্লী-আচারের ক্ষুদ্রতা, বাঙালিজীবনের জড়ত্ব সবলে ভেদ করিয়া একমাত্র নিজের গতিবেগপ্রাবল্যে কঠিন প্রতিকূলতার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া – হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে – করুণার অশ্রুজলপূর্ণ উন্মুক্ত অপার মনুষ্যত্বের অভিমুখে দৃড়নিষ্ঠ একাগ্র একক জীবনকে প্রবাহিত করিয়া লইয়া গিয়াছিলেন, আমি যদি অদ্য তাঁহার সেই গুণকীর্তন করিতে বিরত হই তবে আমার কর্তব্য অসম্পন্ন থাকিয়া যায়।’ আমরা সকলেই বিদ্যাসাগরের নারী-শিক্ষা এবং নারী-স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে লড়াইয়ে তাঁর আত্মত্যাগের কথা জানি। এছাড়াও দেশের হতদরিদ্র মানুষের জন্য তাঁর হৃদয় কাঁদতো বলেই মানুষ তাকে ‘দয়ার সাগর’ উপাধি দেয়।
তবে এগুলোর বাইরে বিদ্যাসাগরের একটি অন্য দিক ছিলো যা নিয়ে বিশেষ চর্চা হয়না। বন্ধুকে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি কল্য অথবা পরশ্ব আপনাকে দেখিতে যাইব স্থির করিয়াছিলাম কিন্তু এরূপ দুটি রোগীর চিকিৎসা করিতেছি যে তাহাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া যাওয়া কোনমতেই উচিত নহে, এজন্য দু চারি দিন দেওঘর যাওয়া রহিত করিতে হইল।’ অর্থাৎ ডিগ্রি না থাকলেও চিকিৎসা করতেন বিদ্যাসাগর।
সমাজের অনগ্রসর সম্প্রদায়ের ‘হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার’ হয়ে উঠেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁর জীবনের শেষভাগ কাটিয়েছেন বর্তমান ঝাড়খণ্ডের কার্মাটাঁড়ে আর সেখানেই আদিবাসী মানুষের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ভাই শম্ভুচন্দ্র স্মৃতিচারণ করেছেন, ‘‘তিনি (বিদ্যাসাগর) প্রাতঃকাল হইতে বেলা দশ ঘটিকা পর্যন্ত সাঁওতাল রোগীদিগকে হোমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসা করিতেন এবং পথ্যের জন্য সাগু, বাতাসা, মিছরি প্রভৃতি নিজে প্রদান করিতেন। অপরাহ্নে পীড়িত সাঁওতালদের পর্ণকুটিরে যাইয়া তত্ত্বাবধান করিতেন। তাহাদের কুটিরে যাইলে তাহারা সমাদরপূর্বক বলিত, ‘তুই আসেছিস!’ তাহাদের কথা অগ্রজের বড় ভালো লাগিত।’’
বিদ্যাসাগর দেখেছিলেন তাঁদের সহজ, সরল জীবনযাত্রা। যেখানে ছিল না কোনও দ্বিচারিতা বা জটিলতা। সেখানের মেথরপল্লিতে উপস্থিত থেকে তিনি নিজের হাতে পরম যত্নে কলেরা রোগীর শুশ্রূষা করেছেন। একবার সেখানে একটি ছেলের নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ায় তাঁর ডাক পড়ে। তৎক্ষণাৎ তিনি হোমিওপ্যাথি ওষুধ ও একটি পাথরের বাটি সঙ্গে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে রোগীকে এক ডোজ় খাওয়াতেই রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। এ কাহিনি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী শুনিয়েছেন। ১৮৬৯-৭০ সালে বর্ধমানে ম্যালেরিয়াতে প্রচুর মানুষ মারা যায়। সেই সমস্ত মানুষদের বিনা পয়সায় ওষুধ দিয়ে সুস্থ করে তোলেন বিদ্যাসাগর। বর্ধমানে বিদ্যাসাগর নিজে চিকিৎসার জন্য আরোগ্য-নিকেতন খোলেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে বুঝিয়ে আরও অনেক চিকিৎসাকেন্দ্র খোলার ব্যবস্থা করেন। জানা যায় রোগীদের কুইনাইন দিতে নিজেও চলে যেতেন তাদের বাড়িতে।
সারা জীবন অজস্র ব্যধিতে ভুগেছেন তিনি। ফলে সেটিও তাঁর হোমিওপ্যাথি চর্চার অন্যতম বিষয় হয়ে ওঠে। যদিও শুধু চিকিৎসা করে রোগীকে সুস্থ করে তোলাই নয়, বিদ্যাসাগর আবিস্কার করে ফেলেছিলেন হোমিওপ্যাথির অন্যতম একটি ওষুধও। হাঁপানির রোগ থাকায় বিদ্যাসাগর শীতকালে খুব কষ্ট পেতেন , তাই শীতে দু’বেলা গরম চা খেতেন। এক দিন চা খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাঁপের টান একদম কমে গেল।
গৃহভৃত্যকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘আজ চায়ে কি আদার রস মিশিয়েছিলে?’’ গৃহভৃত্য বলল, সে কিছুই মেশায়নি। বিদ্যাসাগরের বিশ্বাস না হওয়ায় কেটলি খুলে তিনি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কেটলির মধ্যে দুটি আরশোলা পড়ে আছে এবং সেটি ফোঁটানো চা তিনি পান করেছেন। বিদ্যাসাগরের অনুসন্ধিৎসু মন ঠিক করে ফেলল, আরশোলা বেশি জলে সেদ্ধ করার পর, তাকে অ্যালকোহলে ফেলে ছেঁকে ডাইলিউট করে হোমিয়োপ্যাথির মতে ওষুধ বানিয়ে নিজে ও অন্যদের দিয়ে পরীক্ষা করে দেখবেন। এরপরেই আবিষ্কার করলেন ব্লাট্টা অরিয়েন্টালিস (Blatta orientalis)।
ভুবনকৃষ্ণ মিত্র তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, বহু রোগীকে না জানিয়ে তিনি এই ওষুধ খাওয়ান এবং সাফল্য পাওয়ার পর রীতিমতো ব্যবহার হতে শুরু করে তাঁর তৈরি এই ওষুধ। ডিগ্রীধারী ডাক্তারদের পাশে ‘মেটিরিয়া মেডিকায়’ এই ওষুধের প্রথম প্রয়োগকর্তা হিসেবে নাম আছে পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরেরও।
