নিউজ ডেস্ক: ভারত-মার্কিন সম্পর্কে সবকিছু যে মসৃণ পথে এগোচ্ছে না, তা এবার স্পষ্ট ভাষায় জানালেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা, মার্কিন শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাস এই একাধিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে বলে জানালেন তিনি। তবে জয়শঙ্করের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সন্ত্রাসের প্রশ্ন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে কোনও ঘনিষ্ঠ অংশীদার যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে না বুঝলে তার প্রভাব দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও পড়তে পারে।
নিউইয়র্কে Asia Society-র একটি অনুষ্ঠানে প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিক ড্যানিয়েল রাসেলের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন জয়শঙ্কর। সেখানেই ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খোলেন তিনি। বিদেশমন্ত্রীর কথায়, দুই দেশের সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ‘bumps’ তৈরি হয়েছে। তার পিছনে রয়েছে মূলত বাণিজ্য আলোচনা কতটা দ্রুত এগোচ্ছে, আলোচনার জটিলতা এবং মার্কিন tariff policy-র পরিবর্তন।
ভারতের সঙ্গে আমেরিকার trade agreement নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। জয়শঙ্কর জানান, এই আলোচনায় ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামো একটি বড় বিষয়। দেশে বিপুল সংখ্যক ছোট উৎপাদক, কৃষক এবং বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের স্বার্থ রয়েছে। ফলে একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে একাধিক পক্ষের স্বার্থকে মাথায় রাখতে হচ্ছে। তাঁর মতে, এই কারণেই আলোচনা প্রত্যাশার তুলনায় বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে বাণিজ্য নিয়ে আলোচনায় এখন দুই পক্ষের মধ্যে মোটামুটি একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে বলেই জানিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর মতে, এখন বড় প্রশ্ন হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের tariff framework-এ যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব কীভাবে পড়বে। Reciprocal tariff নিয়ে আইনি পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর Section 301-এর অধীনে নতুন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা এখনও রয়েছে।
কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে জয়শঙ্করের বক্তব্যে উঠে এসেছে সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গ। ভারতের জন্য terrorism যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যু, তা বোঝাতে গিয়ে বিদেশমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দশক ধরে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসের মুখোমুখি হয়েছে ভারত।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা, ভারতের কাছে যদি কোনও বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়, অথচ সেই বিষয়টি কোনও partner country যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে না বোঝে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেই সম্পর্কের উপর তার প্রভাব পড়বে।
জয়শঙ্করের কথায়, ভারতের প্রধান উদ্বেগগুলির মধ্যে terrorism অন্যতম। তাই এই বিষয়ে ভারতের অবস্থান, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে অংশীদার দেশগুলির যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জয়শঙ্করের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে তীব্র বাকযুদ্ধ হয়েছে। কয়েকদিন আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে জয়শঙ্কর ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে স্বাভাবিক করার অভিযোগ তোলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার ভারত প্রয়োগ করবে।
মে ২০২৫-এর ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাতের প্রসঙ্গও রাষ্ট্রসংঘে উঠে আসে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী সেই সংঘাতকে আত্মরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের প্রশংসা করেছিলেন। ভারত অবশ্য বরাবরই জানিয়েছে, সংঘর্ষের পর ceasefire নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ হয়েছিল এবং কোনও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা ছিল না।
নিউইয়র্কের আলোচনায় ভারতের strategic autonomy নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কও ক্রমশ multipolar হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, দেশগুলি এখন আর একটি মাত্র শক্তির উপর নির্ভর না করে একাধিক দেশের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখছে।
এই প্রসঙ্গে আমেরিকার নীতিরও উল্লেখ করেন তিনি। জয়শঙ্করের বক্তব্য, একটা সময় ওয়াশিংটনে এমন ধারণা ছিল যে ভারতের খুব বেশি strategic options থাকা উচিত নয়। কিন্তু বর্তমানে সেই অবস্থান অনেকটাই বদলেছে। আমেরিকাও এখন একই সঙ্গে China, Russia, Europe, Ukraine এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করছে।
অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ বদলাচ্ছে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের নিজস্ব স্বার্থ এবং নিরাপত্তাকে সামনে রেখে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতিই যে নয়াদিল্লির কূটনীতির অন্যতম ভিত্তি, জয়শঙ্করের বক্তব্যে ফের সেই বার্তাই উঠে এল।
বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের বর্তমান ছবির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট, trade, tariffs এবং terrorism। বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার জটিলতা থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বোঝাপড়ার জায়গা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সন্ত্রাসের প্রশ্নে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে কোনও অংশীদার দেশ কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জয়শঙ্করের বক্তব্যে সেই বার্তাই সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে।
