নিউইয়র্ক: সন্ত্রাসবাদ নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় ফের কড়া অবস্থান জানাল ভারত। ৮১তম রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর স্পষ্ট করে দেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থানে কোনওরকম শিথিলতা আসছে না। সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়া সরকারগুলিকে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি সন্ত্রাসের অর্থের জোগানদাতা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
জয়শঙ্করের বক্তব্যে উঠে আসে ভারতের আত্মরক্ষার অধিকারের বিষয়টিও। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার অধিকার ভারত প্রয়োগ করবে। একইসঙ্গে সন্ত্রাসবাদকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা বা তার পরিণতি থেকে দায়মুক্তি পাওয়ার যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন বিদেশমন্ত্রী।
বিদেশমন্ত্রী আরও বলেন, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ বিশেষভাবে আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য বড় হুমকি। যে সরকার বা রাষ্ট্র এই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের দায়বদ্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সন্ত্রাসে অর্থ জোগানের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে তা বন্ধ করার উপরও জোর দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
জয়শঙ্করের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, “বন্ধুত্ব ও সদিচ্ছা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে একসঙ্গে চলতে পারে না।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনও পক্ষ সন্ত্রাসবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকলে সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি বোঝাপড়াগুলিও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়বে। সন্ত্রাসের পথ বেছে নেওয়া পক্ষকেই নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জয়শঙ্কর সরাসরি পাকিস্তানের নাম না নিলেও তাঁর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল স্পষ্ট। এক দিন আগে রাষ্ট্রপুঞ্জের একই মঞ্চে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ কাশ্মীর এবং ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তার পরের দিনই জয়শঙ্কর ‘সন্ত্রাসবাদের ধারাবাহিক চর্চাকারী’ একটি পক্ষের বক্তব্যের সমালোচনা করেন এবং বলেন, সন্ত্রাসবাদকে স্বাভাবিক করার বা তার পরিণতি থেকে দায়মুক্তি দাবি করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাঁর বক্তব্যকে পাকিস্তানের প্রতি পরোক্ষ বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
তবে শুধু সন্ত্রাসবাদ নয়, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির আরও কয়েকটি বিষয় নিয়েও বক্তব্য রাখেন বিদেশমন্ত্রী। ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা এবং খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের মতো বিষয়ও তাঁর বক্তব্যে জায়গা পায়। বাণিজ্যিক জাহাজ ও আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলকারী নাবিকদের নিশানা করা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান প্রয়োজন। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন তিনি। খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান বিদেশমন্ত্রী।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চে জয়শঙ্করের এই বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের অবস্থান ফের স্পষ্ট হল। বিশেষ করে আত্মরক্ষার অধিকার, সন্ত্রাসে মদতদাতাদের জবাবদিহি এবং সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্ন, এই তিনটি বিষয় তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
