বিশেষ প্রতিবেদন: হর্নেট দেখলেই অধিকাংশ প্রাণী নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়। আর এশীয় জায়ান্ট হর্নেটের মতো ভয়ঙ্কর প্রজাতি হলে তো কথাই নেই। বিশ্বের সবচেয়ে বড় হর্নেটগুলির মধ্যে অন্যতম এই পতঙ্গের হুলে তীব্র যন্ত্রণা তো হয়ই, বিষ ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতীও হতে পারে। কিন্তু জাপানের একটি ব্যাঙের কাছে সেই হর্নেটই আবার খাবার! শুধু খাবার নয়, হুলের ভয়কে কার্যত উপেক্ষা করেই শিকার করে সেটিকে গিলে ফেলছে সে।
ব্যাঙটির নাম ব্ল্যাক-স্পটেড পন্ড ফ্রগ, বৈজ্ঞানিক নাম Pelophylax nigromaculatus। জাপানে এই ব্যাঙের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছেন কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ শিনজি সুগিউরা। প্রশ্ন ছিল একটাই, ব্যাঙগুলি কি হর্নেটের হুল এড়িয়ে শিকার করে, নাকি সত্যিই হর্নেটের বিষ সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে? উত্তর খুঁজতে গবেষণাগারে ব্যাঙের সামনে তিন ধরনের হর্নেট ছাড়া হয়েছিল—Vespa simillima, Vespa analis এবং বিশ্বের বৃহত্তম হর্নেট প্রজাতিগুলির একটি Vespa mandarinia, অর্থাৎ এশীয় জায়ান্ট হর্নেট। প্রতিটি প্রজাতির ১৫টি করে কর্মী হর্নেট ব্যবহার করা হয়েছিল।
ফল দেখে চমকে উঠেছেন গবেষকেরা। প্রথম প্রজাতির ১৫টির মধ্যে ১৪টি হর্নেটকে ব্যাঙ আক্রমণ করে এবং ১৩টিকেই খেয়ে ফেলে। দ্বিতীয় প্রজাতির ক্ষেত্রে ১৫টির সব ক’টিকেই আক্রমণ করে ব্যাঙ, ১৩টিকে গিলে নেয়। আর সবচেয়ে বড় এশীয় জায়ান্ট হর্নেটের ক্ষেত্রেও ১৪টি ব্যাঙ শিকার করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, যার মধ্যে ১১টি শেষ পর্যন্ত হর্নেট খেয়ে ফেলে। অর্থাৎ তিন প্রজাতির ক্ষেত্রে সফল শিকারের হার যথাক্রমে ৯৩%, ৮৭% এবং ৭৯%।
আরও বিস্ময়কর বিষয়, হর্নেটগুলি আত্মরক্ষায় চুপ করে থাকেনি। ব্যাঙের মুখ, চোখ, জিভ, তালু এমনকি গলার কাছেও হুল ফুটিয়েছে তারা। বেশ কয়েকটি ব্যাঙকে একাধিক বার হুল ফোটানো হয়েছে। তবু কোনও ব্যাঙ মারা যায়নি। হুলের আঘাতের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তারা স্বাভাবিক আচরণে ফিরে এসেছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিকার গিলে ফেলেছে।
এখানেই রহস্য। কারণ হর্নেটের বিষ যে কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে আগের গবেষণাতেও প্রমাণ রয়েছে। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এশীয় জায়ান্ট হর্নেটের একটি হুল ২৭০ গ্রাম ওজনের ইঁদুরের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী মাত্রার বিষ সরবরাহ করতে পারে। অথচ পরীক্ষায় ব্যবহৃত ব্যাঙগুলির ওজন ছিল মাত্র ৬ থেকে ৭৬ গ্রাম। অর্থাৎ আকারে অনেক ছোট হয়েও তারা বার বার হুলের আঘাত সামলেছে।
তবে ব্যাঙের এই ‘সুপার পাওয়ার’-এর রহস্য এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। গবেষক সুগিউরার পরীক্ষায় প্রমাণ হয়েছে যে ব্যাঙগুলি হর্নেটের হুল সহ্য করে শিকার করতে সক্ষম। কিন্তু ঠিক কোন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় তারা হর্নেটের বিষের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বেঁচে যাচ্ছে, তার উত্তর এখনও অজানা। এখানেই অন্য একটি গবেষণার সূত্র কাজে আসতে পারে। বিষাক্ত ব্যাঙ ও পাখির ক্ষেত্রে গবেষকেরা দেখেছেন, কোনও প্রাণী বিষ সহ্য করতে পারার পিছনে শুধু স্নায়ুর কোষে পরিবর্তনই দায়ী নয়; রক্তের প্লাজমায় থাকা বিশেষ প্রোটিনও বিষকে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে বাধা দিতে পারে। যদিও সেই গবেষণা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বিষ এবং ভিন্ন প্রাণী নিয়ে, তবু হর্নেটের বিষ সহ্য করার রহস্য খুঁজতে তা বিজ্ঞানীদের নতুন দিশা দিতে পারে।
এই গবেষণার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। সাধারণত প্রাণীজগতে বিষধর শিকারিকে খেতে গেলে শিকারিকে আগে কী ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, সেটাই বেশি আলোচনায় আসে। কিন্তু জাপানের এই ব্যাঙের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা—হর্নেট পাল্টা আক্রমণ করছে, হুল ফুটিয়ে যাচ্ছে, তবু ব্যাঙ পিছিয়ে যাচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ব্যাঙের আকারও গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক বড় ব্যাঙগুলি হর্নেট খাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সফল হয়েছে। অর্থাৎ শরীরের আকারের সঙ্গে হুল সহ্য করার ক্ষমতার কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। তবে সেই সম্পর্কের প্রকৃতি জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এখন বিজ্ঞানীদের সামনে তাই নতুন প্রশ্ন—হর্নেটের ভয়ঙ্কর বিষ কী ভাবে এই ব্যাঙের শরীরে কাজ করে না? সেই উত্তর মিললে শুধু এই অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাসের রহস্যই নয়, মেরুদণ্ডী প্রাণীর শরীরে বিষের প্রভাব এবং তা প্রতিরোধের প্রক্রিয়া সম্পর্কেও নতুন তথ্য মিলতে পারে। আপাতত জাপানের পুকুরের এই ব্যাঙ প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে—যে শিকারিকে অন্যরা ভয় পায়, কারও কাছে সেই শিকারিই হয়ে উঠতে পারে প্রিয় খাবার।
