রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দিলেন স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন। ছাত্রছাত্রীর অভাবে কার্যত অস্তিত্বের সংকটে পড়া বহু জুনিয়র হাইস্কুলকে নিকটবর্তী হাইস্কুলের সঙ্গে একীভূত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে রাজ্য সরকার। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে পৃথক জুনিয়র হাইস্কুলের বদলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পঠনপাঠনও একই হাইস্কুলের অধীনেই পরিচালিত হতে পারে।
জলপাইগুড়িতে অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের জেলা সম্মেলনে যোগ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী জানান, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অতীতে পরিকল্পনাহীনভাবে বহু জুনিয়র হাইস্কুল গড়ে তোলা হয়েছিল। অথচ সেই স্কুলগুলির পাশেই রয়েছে পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুল। ফলে একই এলাকায় দুটি সরকারি স্কুল থাকা সত্ত্বেও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ভাগ হয়ে যাচ্ছে। অনেক জুনিয়র হাইস্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা এতটাই কম যে সেগুলি কার্যকরভাবে পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে উঠছে।
শিক্ষামন্ত্রীর কথায়, "অবৈজ্ঞানিকভাবে অনেক জায়গায় হাইস্কুলের পাশেই জুনিয়র হাইস্কুল তৈরি হয়েছে। ছাত্রছাত্রীর অভাবে ওই স্কুলগুলি সমস্যায় পড়ছে। সেগুলিকে হাইস্কুলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আমরা ভাবছি।"
রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের একাংশের মতে, শুধুমাত্র ছাত্রসংখ্যা কমে যাওয়াই নয়, শিক্ষক বণ্টন, পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও এই ধরনের একাধিক ছোট স্কুল পরিচালনা একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুল একীভূত হলে শিক্ষক ও পরিকাঠামোর আরও কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কোন কোন স্কুল একীভূত হবে, শিক্ষকদের পদায়ন কীভাবে হবে, ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের সমস্যা তৈরি হবে কি না— এমন একাধিক প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি।
এদিন জনগণনা নিয়েও শিক্ষকদের উদ্বেগের প্রসঙ্গ ওঠে। বর্তমানে রাজ্যের বহু প্রাথমিক শিক্ষক জনগণনার কাজে যুক্ত রয়েছেন। ফলে একদিকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, অন্যদিকে সরকারি দায়িত্ব— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষক সংগঠনের একাংশ।
এই প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, "জনগণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্ব। আবার স্কুলের পঠনপাঠনও যাতে ব্যাহত না হয়, সেটাও আমাদের দেখতে হবে। দু'টির মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে সরকার ভাবছে।"
শুধু স্কুলের কাঠামো নয়, নজরদারি ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি আরও নির্ভুলভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ধাপে ধাপে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে প্রতিদিনের উপস্থিতির তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং অনুপস্থিতির প্রবণতার উপরও নজর রাখা সহজ হবে বলে মনে করছে শিক্ষা দপ্তর।
শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, ছাত্রসংখ্যা ক্রমশ কমে যাওয়ার প্রবণতা, জন্মহার হ্রাস, বেসরকারি স্কুলের প্রতি ঝোঁক এবং জনসংখ্যার স্থানান্তরের ফলে রাজ্যের বহু সরকারি স্কুলেই পড়ুয়ার সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। এই পরিস্থিতিতে স্কুল একীভূত করার ভাবনা নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন রাজ্যেও ছাত্রসংখ্যা ও পরিকাঠামোর ভিত্তিতে সরকারি স্কুল পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিরোধীদের একাংশের আশঙ্কা, শুধুমাত্র প্রশাসনিক সুবিধার কথা ভেবে স্কুল একীভূত করা হলে বহু গ্রামীণ এলাকার ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে পৌঁছতে অতিরিক্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে হতে পারে। ফলে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। তাই কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় পরিস্থিতি, ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ এবং শিক্ষকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠতে শুরু করেছে।
ফলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত এই সম্ভাব্য পরিবর্তন এখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, আগামী দিনে স্কুলশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।