লাদাখের নাম শুনলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে লেহ, নুব্রা ভ্যালি বা প্যাংগং লেকের ছবি। কিন্তু এই জনপ্রিয় পর্যটনস্থলের বাইরেও রয়েছে এমন এক উপত্যকা, যেখানে আজও প্রকৃতি নিজের আসল রূপ ধরে রেখেছে। সেই জায়গার নাম জান্সকার। নির্জন পাহাড়, নীলচে নদী, প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ আর শান্ত পরিবেশের জন্য এই অঞ্চলকে অনেকেই "লাস্ট শাংগ্রি-লা" নামে চেনেন।
লাদাখের কার্গিল জেলার দুর্গম এই উপত্যকার চারপাশ ঘিরে রয়েছে হিমালয় ও জান্সকার পর্বতমালা। মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ নীল জান্সকার নদী। গ্রীষ্মকালে নদীর জল পান্নার মতো সবুজ-নীল রঙে ঝলমল করে, আর শীত পড়তেই সেই নদী বরফে ঢেকে যায়। তখনই শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাডভেঞ্চার ট্রেক 'চাদার ট্রেক'। জমে যাওয়া নদীর উপর দিয়েই কয়েক দিন ধরে হাঁটেন অভিযাত্রীরা। চারদিকে বরফের দেওয়াল আর মাথার উপরে নীল আকাশ— এই অভিজ্ঞতা সত্যিই অনন্য।
জান্সকার ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় জুন থেকে সেপ্টেম্বর। এই সময় রাস্তা খোলা থাকে এবং গাড়িতে সহজেই পৌঁছানো যায়। সবুজ উপত্যকা, ছোট ছোট গ্রাম, পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা বৌদ্ধ মঠ এবং শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করে। ভ্রমণের সময় ঘুরে দেখতে পারেন কারশা মঠ, রংদুম মঠ ও পেনে লা পাস। রোমাঞ্চপ্রিয়দের জন্য রয়েছে জান্সকার নদীতে রিভার রাফটিংয়ের সুযোগ, যা ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় রাফটিং রুট হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় জান্সকারের একেবারে ভিন্ন রূপ দেখা যায়। তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। তখন সড়কপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং জমে যাওয়া নদীই হয়ে ওঠে চলাচলের একমাত্র পথ। কঠিন হলেও এই সময়ের চাদার ট্রেক জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে।
জান্সকারে যাওয়ার জন্য শ্রীনগর থেকে কার্গিল হয়ে পাদুম পৌঁছানো সবচেয়ে সুবিধাজনক। এছাড়া মানালি থেকে দারচা ও শিঙ্গো লা পেরিয়েও যাওয়া যায়। থাকার জন্য পাদুমে হোমস্টে ও ছোট গেস্ট হাউসের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক, এটিএম বা আধুনিক শহুরে সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত। তাই পর্যাপ্ত নগদ টাকা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং গরম পোশাক সঙ্গে নেওয়া জরুরি। উচ্চতার কারণে শরীর খারাপের আশঙ্কা থাকায় প্রথম দু'দিন বিশ্রাম নেওয়াই ভালো।
যাঁরা প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি সময় কাটাতে চান, শহরের কোলাহল থেকে দূরে কয়েক দিন নিস্তব্ধতার মধ্যে থাকতে চান, তাঁদের জন্য জান্সকার হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। বিলাসিতার বদলে এখানে অপেক্ষা করছে পাহাড়ের নীরবতা, স্বচ্ছ নদীর স্রোত, তারাভরা আকাশ আর এক অনন্য ভ্রমণের স্মৃতি।