কলকাতা: একজন ব্রেন-ডেথ রোগীর অঙ্গ বাঁচিয়ে দিতে পারে পাঁচ-ছয় জন মানুষের জীবন। সেই জীবনদানের লড়াইয়েই বড় ধাক্কা। গত এক বছরে রাজ্যের অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএম (পিজি)-এ একটিও মরণোত্তর অঙ্গদান (Cadaver Organ Donation) সম্ভব হয়নি। অথচ এক সময় এই হাসপাতালই পূর্ব ভারতের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অন্যতম ভরসাস্থল ছিল। পরিসংখ্যান সামনে আসতেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে চিকিৎসক মহল থেকে অঙ্গদান আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়, রাজ্যে প্রতি বছর শত শত রোগী কিডনি, লিভার, হার্ট কিংবা ফুসফুস প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় থাকেন। তাঁদের অনেকের জীবন নির্ভর করে মরণোত্তর অঙ্গদানের উপর। কিন্তু পিজির মতো তৃতীয় স্তরের সরকারি হাসপাতালে টানা এক বছর অঙ্গদান না হওয়ায় কার্যত থমকে গিয়েছে বহু সম্ভাব্য প্রতিস্থাপন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু চিকিৎসা পরিকাঠামোর নয়। ব্রেন-ডেথ রোগী দ্রুত চিহ্নিত করা, পরিবারের সদস্যদের সঠিক সময়ে কাউন্সেলিং, অঙ্গ সংগ্রহের জন্য প্রশিক্ষিত সমন্বয়কারী এবং হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়—এই গোটা ব্যবস্থাতেই একাধিক ফাঁক রয়ে গিয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য অঙ্গদাতাকে হারাতে হচ্ছে।
অঙ্গদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে সচেতনতা বাড়লেও সরকারি হাসপাতালগুলিতে সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়নি। ফলে বহু পরিবার অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই পান না। তাঁদের দাবি, চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কাউন্সেলর নিয়োগ এবং ব্রেন-ডেথ শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া আরও সক্রিয় করা জরুরি।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে মরণোত্তর অঙ্গদানের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কিছু ইতিবাচক সাফল্য মিললেও, সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি রাজ্যের বৃহত্তম সরকারি হাসপাতাল। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, পরিকাঠামো ও দক্ষ চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও কেন পিজিতে একটিও অঙ্গদান সম্ভব হল না?
স্বাস্থ্য মহলের একাংশের মতে, অঙ্গদান কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি সামাজিক সচেতনতা ও প্রশাসনিক দক্ষতারও পরীক্ষা। কারণ একজন মৃত ব্যক্তির অঙ্গ নতুন জীবন দিতে পারে একাধিক মরণাপন্ন মানুষকে। তাই পিজির এই এক বছরের 'শূন্য' পরিসংখ্যান নিছক একটি সংখ্যা নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া বহু সম্ভাব্য জীবনের প্রতীক।
এখন নজর স্বাস্থ্য দপ্তরের দিকে। অঙ্গদান প্রক্রিয়াকে চাঙ্গা করতে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয় কি না, এবং রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে জীবন বাঁচানোর এই আন্দোলন ফের গতি পায় কি না, সেটাই দেখার।