স্পোর্টস ডেস্ক: বিদায়টা যে এতটা আবেগঘন হবে, তা হয়তো লিও মেসি নিজেও ভাবতে পারেননি। দেশের জার্সিতে শেষবার মাঠে নেমে আর্জেন্টিনাকে বেনিনের বিরুদ্ধে ৩-০ জেতালেন। নিজে পেনাল্টি থেকে গোল করলেন, করালেন আরও দু’টি। কিন্তু ম্যাচ শেষ হতেই মাইক্রোফোন হাতে মেসির গলায় ফুটে উঠল অন্য সুর। চোখে জল, গলায় আবেগ, আর তার মধ্যেই সতীর্থ, তরুণ প্রজন্ম এবং সমর্থকদের উদ্দেশে কড়া বার্তা। জানিয়ে দিলেন, আর্জেন্টিনার সাফল্য অনেকেরই পছন্দ নয়। তাই সামনে এগোতে হলে সবাইকে একজোট থাকতে হবে। দেশের জার্সিতে এটাই মেসির শেষ ম্যাচ। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে তিনি বললেন, "আমি এখানে সারাজীবন খেলতে চাইতাম। কিন্তু সময় সবার জন্যই এগিয়ে যায়।"
ম্যাচের পর মেসির বক্তব্যের শুরুটাই ছিল কৃতজ্ঞতায় ভরা। বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে উপস্থিত সমর্থকদের পাশাপাশি গোটা বিশ্বের আর্জেন্টাইন ফুটবলপ্রেমীদের ধন্যবাদ জানান তিনি। তাঁর কথায়, দেশের জার্সি গায়ে বিশ্বের যে প্রান্তেই খেলতে গিয়েছেন, সমর্থকদের ভালোবাসা তাঁকে মনে করিয়েছে যেন নিজের বাড়ির মাঠেই রয়েছেন। মেসি বলেন, "এই জার্সি পরে তোমাদের সামনে খেলতে চাইতাম চিরকাল। কিন্তু সেটা সম্ভব নয়।" বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা-সহ একের পর এক ট্রফি জয়ের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, জীবনের প্রায় সব স্বপ্নই পূরণ হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ জয় তাঁর কাছে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। তবে সেই পথ মোটেই সহজ ছিল না। বারবার ব্যর্থতা, সমালোচনা, চাপ—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তাঁকে এগোতে হয়েছে। সতীর্থদের পাশে থাকার জন্যও আবেগঘন ধন্যবাদ জানান আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
এর পরেই মেসির বক্তব্য পায় এক অন্য মাত্রা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সতর্ক করে তিনি বলেন, আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ঐক্য ধরে রাখতেই হবে। তাঁর কথায়, "আমরা যখন একসঙ্গে থাকি, তখন যে কোনও দলের চেয়ে শক্তিশালী।" শুধু মাঠের লড়াই নয়, দলের বাইরে থেকেও যে নানা ধরনের সমালোচনা ও নেতিবাচকতা আসে, সেটাও বুঝিয়ে দেন তিনি। মেসির দাবি, এমন মানুষও রয়েছেন যাঁরা চান না আর্জেন্টিনা জিতুক। তাঁদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র পথ হিসেবে ঐক্যের কথাই বলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে দলের সংহতির গুরুত্বও। মেসির মতে, শক্তিশালী দল ছাড়া বড় কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়। আর সেই কারণেই তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা এত সাফল্য পেয়েছে। বিদায়ের মুহূর্তে তরুণ ফুটবলারদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, এর পর থেকে গ্যালারিতে বসে নতুন প্রজন্মকে সমর্থন করবেন।
বিদায়ের শেষ মুহূর্তে অবশ্য আবেগ সামলাতে পারেননি মেসি। জানিয়ে দিলেন, দেশের জার্সির রং, সমর্থকদের ভালোবাসা, এই মাঠ—সবকিছুকেই ভীষণভাবে মিস করবেন। বললেন, "আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই না। মাঠ ছাড়তেও চাই না।" দেশের হয়ে খেলা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মানের বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে বহু বছরের অপেক্ষার পর আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে সতীর্থ এবং সমর্থকদের হাত ধরেই, সেই কথাও স্মরণ করেন। শেষ পর্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলেন, তিনি চিরকালই আর্জেন্টাইন থাকবেন। দেশের জার্সিতে শেষ ম্যাচে ৩-০ জয়, নিজের গোল ও দু’টি অ্যাসিস্ট—তার পরেই এমন আবেগঘন বিদায়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির অধ্যায় শেষ হলেও তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার যে আর্জেন্টিনার ফুটবলে বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
