নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-কে ঘিরে নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরাল হল। এবার ECINET সফটওয়্যারে স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিকদের আরও ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানাল মহারাষ্ট্রের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) এস চোক্কালিঙ্গম। SIR-এর নোটিস পর্বে ভোটারদের তথ্য যাচাই এবং ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ সংক্রান্ত মামলায় Electoral Registration Officer বা ERO-দের হাতে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ চেয়ে কমিশনের কাছে চারটি পরিবর্তনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভোটার তালিকা তৈরি, দাবি-আপত্তি শোনা এবং কোনও নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনে ERO-দের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু মহারাষ্ট্রের CEO-র বক্তব্য অনুযায়ী, ECINET-এর বর্তমান কাঠামোয় সব ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের প্রয়োজনীয় বিকল্প পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মাঠে থাকা আধিকারিক এবং সফটওয়্যারের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্যে তৈরি হচ্ছে সমস্যা।
‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ মানেই ভোটার অযোগ্য নন
SIR-এর সময় ECINET কোনও ভোটারের বর্তমান তথ্যকে আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। সেই প্রক্রিয়ায় বাবা-মা বা ঠাকুর্দা-ঠাকুমার নামের সঙ্গে অমিল, বয়সের অসঙ্গতি বা পুরনো তালিকায় আত্মীয়ের তথ্যের সঙ্গে যোগসূত্র না পাওয়ার মতো বিষয় সামনে এলে সেটিকে ‘logical discrepancy’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তবে কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই অসঙ্গতি কোনও ভোটারকে সরাসরি অযোগ্য ঘোষণা করে না। এটি মূলত তথ্যের অমিল বা mismatch। প্রয়োজনীয় নথি এবং শুনানির মাধ্যমে সেই অসঙ্গতি মেটানো সম্ভব।
মহারাষ্ট্রের CEO-র দাবি, কোনও ERO যদি নথিপত্র দেখে সন্তুষ্ট হন, তা হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভোটারকে ব্যক্তিগত শুনানিতে হাজির করানোর প্রয়োজন নেই। বিশেষত প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং অন্যান্য দুর্বল শ্রেণির ভোটারদের ক্ষেত্রে এই নমনীয়তা জরুরি। সেই কারণেই ECINET-এ ‘Exempted from Hearing’-এর মতো পৃথক বিকল্প রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ERO-র হাতে আরও সিদ্ধান্তের ক্ষমতা
মহারাষ্ট্রের CEO আরও চেয়েছেন, প্রয়োজনীয় নথি দেখে ERO সন্তুষ্ট হলে ‘logical discrepancy’ সংক্রান্ত মামলাগুলি স্থানীয় স্তরেই নিষ্পত্তির সুযোগ থাকুক। অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে নথি বা সিদ্ধান্ত আরও উপরের স্তরে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা যেন না থাকে। এই দাবির পিছনে আরও একটি বিষয় রয়েছে। ERO-রা সাধারণত SDM বা সমমর্যাদার আধিকারিক। ভোটার তালিকা সংক্রান্ত দাবি-আপত্তি গ্রহণ, শুনানি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ECINET-এর সফটওয়্যার কাঠামো তাঁদের হাতে থাকা আইনি ক্ষমতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কমিশনের অন্দরেও উঠেছে প্রশ্ন
মহারাষ্ট্রের CEO-র এই চিঠি আসার আগেই ECINET-এর ভূমিকা এবং ERO-দের ক্ষমতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ভোটার তালিকার দায়িত্ব আইনত যাঁদের হাতে, তাঁদের কাজ করার ক্ষেত্রে সফটওয়্যারের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
মহারাষ্ট্রের CEO-র চিঠি সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এল। প্রশ্ন উঠেছে, ভোটার তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন আইননির্দিষ্ট স্থানীয় আধিকারিক, নাকি সফটওয়্যারের নির্ধারিত অপশনই কার্যত তাঁদের সিদ্ধান্তের পরিসর ঠিক করবে?
ইতিমধ্যেই কিছু নিয়ম শিথিল করেছে কমিশন
মহারাষ্ট্রের CEO-র দাবির পর নির্বাচন কমিশনও SIR-এর নোটিস পর্বে কিছু পরিবর্তন করেছে। ২৬ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর কমিশন জানিয়েছে, ‘logical discrepancy’ হিসেবে চিহ্নিত ভোটারদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথি দেখে ERO ব্যক্তিগত শুনানি থেকে অব্যাহতি দিতে পারবেন। কমিশনের বক্তব্য, গত কয়েক মাসে রাজ্যগুলির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের মতামতের ভিত্তিতে ECINET-এ একাধিক পরিবর্তন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের আরও নমনীয়তার প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও তা কার্যকর করা হবে।
এর পাশাপাশি BLO-দের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে ECINET-এ আপলোড করার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। অর্থাৎ নোটিস পাওয়া প্রত্যেক ভোটারকে নিয়ম করে ব্যক্তিগত শুনানিতে হাজির হতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে।
মহারাষ্ট্রে বিপুল ভোটারকে ঘিরে যাচাই
মহারাষ্ট্রে SIR-এর খসড়া ভোটার তালিকা ৩১ অগস্ট প্রকাশিত হয়েছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগের তালিকার তুলনায় ২ কোটিরও বেশি নাম খসড়া তালিকায় ছিল না। মহারাষ্ট্রের CEO-র বক্তব্য, এদের বড় অংশ মৃত বা অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার। একই সঙ্গে বহু ভোটারের তথ্য নিয়ে ‘logical discrepancy’ ধরা পড়েছে। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—যাঁদের নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্য যাচাই করে ন্যায্য সুযোগ দেওয়া এবং ভুলবশত কোনও যোগ্য ভোটারের নাম বাদ না পড়া।
ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ যতটা প্রশাসনিক, ECINET বিতর্ক ততটাই প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক। মহারাষ্ট্রের CEO-র চিঠি সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে—আইনে যে ক্ষমতা স্থানীয় নির্বাচনী আধিকারিকের, তা প্রয়োগের পথে সফটওয়্যার যেন বাধা না হয়।
