নিউজ ডেস্ক: আশ্বিন মাসে শশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে সপরিবারে আসেন মা দুর্গা - এমনটাই আমরা চিরকাল দেখে আসছি। কিন্তু প্রথম থেকেই মায়ের এমন রূপ পূজিত হতো না। বাংলায় একচালার সপরিবারে দুর্গা পুজোর সূচনা ও ইতিহাসের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে ধর্মীয় বিবর্তন এবং তৎকালীন জমিদার বা রাজপরিবারগুলোর রাজকীয় আরাধনার হাত ধরে। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় বঙ্গদেশে ৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বিষ্ণুপুরের রাজবাড়িতে বা ৮৮৭ বঙ্গাব্দে রাজা কংসনারায়ণের শুরু করা তাহেরপুরে যখন দুর্গা পুজো চালু হচ্ছে, তখন মা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে একক ভাবে পূজা পাচ্ছেন। এখানে সপরিবারের কথা উল্লেখ নেই। আদিযুগে বাংলায় পাল ও সেন আমলেও মহাশক্তি দেবী চণ্ডী বা মহিষাসুরমর্দিনীর একক প্রতিমা পূজার প্রচলন ছিল। তখন এই আরাধনা মূলত কুলদেবী বা বিশেষ ব্রত হিসেবে পালিত হতো। অনেক প্রাচীন পরিবারে দেবী হরগৌরী বা শিব-দুর্গার রূপেও পূজিতা হতেন।
১৬১০ খ্রিস্টাব্দে মুঘল যুগে লক্ষ্মীকান্ত বড়িশায় গড়ে তুললেন আটচালা, স্ত্রী ভগবতী দেবীকে সাথে নিয়ে শুরু করলেন দুর্গা পূজো। লক্ষ্মীকান্তের এই পুজোই সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের প্রথম পুজো হাসাবে পরিচিত। এটিই কলকাতার প্রথম ‘সপরিবারের দুর্গা পুজো’ যেখানে মাতৃমূর্তির সাথে গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক আছেন। প্রজাদের আনন্দ আয়োজনের জন্য লক্ষ্মীকান্ত এই পুজো শুরু করেছিলেন।
আস্তে আস্তে এই একচালা সপরিবারের পুজো ছড়িয়ে পড়লো আরো অনেক জায়গায়। মা আর একা এলেন না, নিয়ে এলেন সবাইকে। ঠিক যেমন সন্তানসন্ততিদের নিয়েই মায়েরা আজও বাপের বাড়ি যান। বাংলায় এভাবেই সাধারণ ঘরোয়া জীবন মিশে গেলো সংস্কৃতিতে।
অন্যদিকে, আধুনিক পন্ডিতরা দুর্গার সাথে সন্তানদের আগমনের এই পরিবর্তিত রূপকে সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। খুব স্পষ্ট ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলেও তারা মনে করেন সারা ভারতে হিন্দু ধর্মের পুনরুত্থান হলেও বাংলায় বৌদ্ধ শাসন চলেছিল সেন পূর্ববর্তী যুগ অবধি। সেন রাজবংশ কট্টর শৈব হওয়ায় এই বৌদ্ধ অধ্যুষিত বাংলায় প্রজাদের ওপর তারা নিজেদের ধর্ম আরোপ করতে চেয়েছিল। সংঘাতের সূত্রপাত সেখানেই। এই বংশের আমলেই শুরু হয়েছিল পেশা ভিত্তিক জাতিভেদ প্রথা। এরপরেই শুরু হয় ইসলামী শাসন এবং তাতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রভাব পড়লো সমাজের ওপর। ইসলাম শাসন শুরুর ফলে সমাজে আবার ধর্মান্তরকরণ শুরু হয় তবে সেটা সামান্য কারণ সমাজপতিরা ছিলেন মূলত হিন্দু ব্রাহ্মণ্য শ্রেণীর। জাতিভেদ প্রথা বজায় রাখার উপায় হিসাবে তারা এমন এক উপায় খুঁজছিলো যেখানে বর্ণাশ্রমটা মানুষের চোখে স্পষ্টভাবে ধরা পরবে। সেখান থেকেই দুর্গামূর্তির সঙ্গে বাকী চার দেব দেবীর আবির্ভাব বলে ধারণা করেন অনেক সমাজতত্ত্ববিদ। সরস্বতী যিনি বিদ্যা ও সংস্কৃতির দেবী, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ শ্রেণীর প্রতিভূ, কার্তিক যুদ্ধবিদ্যার দেবতা অর্থাৎ ক্ষত্রিয় শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করছেন, ধনের দেবী লক্ষ্মী বৈশ্য সমাজের প্রতীক এবং গণেশ বা গণপতি অর্থাৎ বাকি তথাকথিত নিম্নশ্রেণীর প্রতিভু।
১৮ শতকে রামপ্রসাদের মতো কবি অসংখ্য আগমনী ও বিজয়ার গান লিখে গিয়েছেন, যেখানে দেবী একান্তই বাঙালিনী। কৈলাসে থাকেন ও তাঁর বাহন সিংহটিও যেন বাড়ির পোষ্য। শশিভূষণ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, কী আশ্চর্য ভাবে দেবী ক্রমে বাঙালির ঘরের মেয়ে হয়ে গিয়েছেন। ১৯ শতকে মধুসূদন থেকে গিরিশচন্দ্র উমাকে বাংলার লালপেড়ে শাড়ি পরা বাঙালি মেয়ে হিসেবেই যেন দেখেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গণেশ জননী’ থেকে যামিনী রায়ের পটে দেবীকে ‘দ্বিভূজা’ রূপে পাওয়া যায়। সেই ঐতিহ্য মেনে বিকাশ ভট্টাচার্যও তাঁর ‘দুর্গা’ সিরিজে দেবীকে শহর কলকাতার নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিসরেই দেখিয়েছিলেন। তার হাতে ছিল বাজারের থলে কিন্তু কপালে জ্বলজ্বল করছিল ত্রিনয়ন। উমার এই বাপের বাড়ি আসা এবং আবার ফিরে যাওয়া যেন বাংলার চিরন্তন সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন যেখানে প্রকৃত অর্থেই মায়েরা বিবাহিতা মেয়ের বাপের বাড়ি আসার অপেক্ষায় থাকেন। দুর্গা পুজো আসলে প্রতীক্ষা এবং পুনর্মিলনের এক সামাজিক উৎসব। শক্তির আরাধনাকে এমন মানবিক ও পারিবারিক রূপ দেওয়া কেবল বাঙালির পক্ষেই হয়তো সম্ভব হয়েছে।
