নিউজ ডেস্ক: ২৯ সেপ্টেম্বর এলেই ইতিহাসের একটি রক্তাক্ত অধ্যায় নতুন করে মনে করায়। আজ, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, স্বাধীনতা সংগ্রামী মাতঙ্গিনী হাজরার শহিদ দিবস। ১৯৪২ সালের এই দিনেই তমলুকে ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ৭০-এর বেশি। মিছিলের লক্ষ্য ছিল তমলুক থানা ও প্রশাসনিক দফতরের দিকে এগিয়ে যাওয়া। প্রায় ছয় হাজার মানুষের মিছিলের নেতৃত্ব ছিলেন তিনি। পুলিশ গুলি চালালে মাতঙ্গিনী হাজরা আহত হন কিন্তু জাতীয় পতাকা হাতে এগিয়ে যান। তমলুকের বানপুকুর এলাকার তমলুক কোর্টের কাছাকাছি তাঁর মৃত্যু হয় কিন্তু তিনি জাতীয় পতাকা নামতে দেননি। 'গান্ধীবুড়ি'র এই আত্মত্যাগ পরবর্তী সময়ে তমলুক ও মেদিনীপুরে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করে।
আজকের দিনে মাতঙ্গিনী হাজরাকে শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের ‘বীরাঙ্গনা’ হিসেবে স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁর জীবনকে আধুনিক নারীবাদের আলোতেও দেখা যায়। তাঁর সময়ের সামাজিক বাস্তবতা ও বর্তমান নারীবাদী আন্দোলনের ভাষা এক না হলেও তাঁর জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—একজন নারীর বয়স, বৈবাহিক পরিচয়, আর্থিক অবস্থা কিংবা সামাজিক অবস্থান কি তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া ও জনজীবনে অংশগ্রহণের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করতে পারে?
মাতঙ্গিনী হাজরা একটি ছোটো গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মেছিলেন। দারিদ্র্যের কারণে বাল্যকালে প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। অতি অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল আলিনান গ্রামের হাজরা বংশে। মাত্র আঠারো বছর বয়সেই নিঃসন্তান অবস্থায় তিনি বিধবা হন। পরবর্তী সময়ে তিনি আইন অমান্য আন্দোলন, লবণ সত্যাগ্রহ এবং ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৩০-এর দশকে গ্রেফতারও হন। অর্থাৎ তাঁর জীবন দেখায়, সমাজ যে পরিচয়ই চাপিয়ে দিক না কেন, একজন নারী নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকা নিজেই তৈরি করতে পারেন।
আজকের নারীবাদে সর্বত্র সমান সুযোগ, আর্থিক স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রায় আট দশক আগে মাতঙ্গিনী হাজরার লড়াইয়ের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতা, কিন্তু তিনি তাঁর নিজের পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানকে কেবল ভাগ্য বলে মেনে না নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন। তাই আজকের দিনটি কেবল তাঁর মৃত্যু দিন নয়; আধুনিক নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে নারীর স্বক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার এক অনন্য মাইলফলক।
ঐতিহ্যগতভাবে মাতঙ্গিনী হাজরার সময়কালে নারীদের গৃহকোণে ও পারিবারিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখার নিয়ম ছিল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বয়োবৃদ্ধ এক গ্রামীণ বিধবা নারীর এভাবে সামনে থেকে রাজনৈতিক মিছিল পরিচালনা করা এবং থানা ও আদালত দখলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া নারীর রাজনৈতিক অবস্থানকে জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তিনি কেবল নিজে আন্দোলনে অংশ নেননি, বরং সেই মিছিলে বহু নারী স্বেচ্ছাসেবীকে একত্রিত ও অনুপ্রাণিত করেছিলেন, আধুনিক নারীবাদে নারী সংহতির যে ধারণা দেখা যায়, মাতঙ্গিনী হাজরা সেদিন গ্রামীণ নারীদের সংগঠিত করে তার এক বাস্তব রূপ ফুটিয়ে তুলেছিলেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরেও তাঁর থেমে না যাওয়ার সাহসিকতা প্রমাণ করে যে, শারীরিক বা সামাজিক প্রতিকূলতা নারীর বিপ্লবী চেতনাকে দমন করতে পারে না। এটি আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নারীর আপসহীন অবস্থানের প্রতীক। আধুনিক নারীবাদ প্রান্তিকতার (যেমন লিঙ্গ, শ্রেণি ও বয়স) নিরিখে নারীর লড়াইকে দেখে। একজন প্রান্তিক ও বৃদ্ধ গ্রামীণ নারী হিসেবে তাঁর এই উত্থান এবং ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা প্রান্তিক নারীর শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
মাতঙ্গিনী হাজরা কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামের শহিদ নন; তিনি আধুনিক নারীবাদী ভাবনার অনেক আগেই নিজের কর্ম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে, সমাজ পরিবর্তনে ও দেশ গঠনে নারী কোনো সহায়ক শক্তি নয়, বরং চালিকাশক্তি।
