মুম্বই: রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সদর দফতর। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীসের নিজের শহর। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গডকড়ীরও রাজনৈতিক ঘাঁটি। বিজেপির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী দুর্গ বলে পরিচিত সেই নাগপুরেই ফের ধাক্কা খেল গেরুয়া শিবির। মহারাষ্ট্র বিধান পরিষদের নাগপুর ডিভিশন স্নাতক কেন্দ্রের নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীকে হারিয়ে আসন ধরে রাখলেন কংগ্রেসের অভিজিৎ বাঞ্জারি। ৩,২৭১ ভোটের ব্যবধানে তাঁর এই জয় রাজনৈতিক ভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২০ সালের পর ফের একই কেন্দ্রে বিজেপিকে হারিয়ে কংগ্রেস বুঝিয়ে দিল, নাগপুরে গেরুয়া শিবিরের আধিপত্য আর প্রশ্নাতীত নয়।
প্রায় ৫৬ বছর ধরে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল এই কেন্দ্র। দীর্ঘ ২৪ বছর এই কেন্দ্রের বিধান পরিষদ সদস্য ছিলেন নিতিন গডকড়ী। ফলে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া ছিল বিজেপি। প্রচারে নেমেছিলেন ফড়ণবীস ও গডকড়ী দু’জনেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাবও কাজে এল না। প্রায় ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ভোটগণনার পর জয় নিশ্চিত হয় অভিজিতের। তিনি পেয়েছেন ৬৭,২৩১টি ভোট। বিজেপির সুধাকর কোহলে পেয়েছেন ৬৩,৯৬০টি ভোট।
কিন্তু কেন হারতে হল বিজেপিকে? রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
১. দ্বিতীয় পছন্দের ভোটে বদলে গেল অঙ্ক
এই নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে দ্বিতীয় পছন্দের ভোট। স্নাতক কেন্দ্রের নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দের ক্রমানুসারে প্রার্থীদের নম্বর দিতে হয়। প্রথম পছন্দের ভোটে কোনও প্রার্থী নির্দিষ্ট কোটা অর্জন করতে না পারলে দ্বিতীয় পছন্দের ভোট গণনা করা হয়।
নাগপুরেও প্রথম পছন্দের ভোট গণনার পর কোনও প্রার্থী প্রয়োজনীয় কোটা পাননি। ফলে দ্বিতীয় পছন্দের ভোটের হিসাব শুরু হয়। নির্দল প্রার্থী নীতেশ কারালে ২৪ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় পছন্দের ভোটের বড় অংশ অভিজিতের দিকে যাওয়ায় নির্বাচনের ফলাফল ঘুরে যায়। প্রথম পর্যায়ে বিজেপি প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নেন কংগ্রেস প্রার্থী।
২. প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে বিজেপির অন্দরে অসন্তোষ
বিজেপির পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। সুধাকর কোহলেকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত দলের একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে অভিযোগ। প্রাক্তন বিধায়ক অনিল সোলে বিদ্রোহী অবস্থান নিয়েছিলেন বলেও খবর। এর ফলে স্থানীয় স্তরে বিজেপির সংগঠনের মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়।
নির্বাচনের সময় বুথস্তরে সমন্বয় এবং প্রচারের ক্ষেত্রেও সেই অসন্তোষের প্রভাব পড়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের শক্তিশালী সংগঠন থাকা সত্ত্বেও প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে ক্ষোভ বিজেপির ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলেছে।
৩. ছয় বছরের জনসংযোগের সুফল পেলেন অভিজিৎ
বিজেপির হেভিওয়েট নেতাদের প্রচারের বিপরীতে অভিজিৎ বাঞ্জারি জোর দিয়েছিলেন ধারাবাহিক জনসংযোগে। গত ছয় বছর ধরে স্নাতক ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন তিনি। বিদর্ভ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করা এবং স্থানীয় সমস্যার বিষয়ে সক্রিয় থাকা—এই সমস্ত উদ্যোগ তাঁর পক্ষে কাজ করেছে।
শেষ মুহূর্তের প্রচারের বদলে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রস্তুতিকেই হাতিয়ার করেছিলেন কংগ্রেস প্রার্থী। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই ধারাবাহিক জনসংযোগই তাঁকে বিজেপির শক্তিশালী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
৪. বিপুল সংখ্যক ভোট বাতিল
নির্বাচনে বাতিল ভোটের সংখ্যাও বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। মোট ১ লক্ষ ৬৫ হাজার ৯০৬টি ভোটের মধ্যে ১৫ হাজার ৩২টি ভোট বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ১১টি ভোটের মধ্যে একটি বাতিল। ২০২০ সালের নির্বাচনে বাতিল ভোটের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৫৪০। এ বার সেই সংখ্যা আরও বেড়েছে।
অভিযোগ, প্রায় চার হাজার ব্যালটে বিজেপি প্রার্থীর নামের পাশে একাধিক পছন্দের নম্বর লেখা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী ভুল পদ্ধতিতে ভোট দেওয়ায় সেগুলি বাতিল হয়ে যায়। ফলে বিজেপির সম্ভাব্য ভোটের অঙ্কে এর প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
৫. ভোটদানের নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তি
এই নির্বাচনে ভোটারদের সাধারণ পদ্ধতিতে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না। প্রথম পছন্দের প্রার্থীর পাশে ১, দ্বিতীয় পছন্দের প্রার্থীর পাশে ২ এবং পরবর্তী পছন্দের ক্ষেত্রে পরের নম্বর লিখতে হয়েছে। কিন্তু অনেক ভোটার এই পদ্ধতি ঠিকমতো বুঝতে পারেননি। কেউ টিক চিহ্ন দিয়েছেন, কেউ স্বাক্ষর করেছেন, আবার কেউ একই প্রার্থীর পাশে একাধিক নম্বর লিখেছেন। ফলে বিপুল সংখ্যক ব্যালট বাতিল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটদানের পদ্ধতি সম্পর্কে আগাম সচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। ভোটারদের একাংশের এই বিভ্রান্তি নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলেছে।
ফড়ণবীস-গডকড়ীর শহরে কংগ্রেসের জয় কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?
নাগপুরের ফলাফল বিজেপির কাছে নিঃসন্দেহে অস্বস্তির। কারণ, এই শহর শুধু ফড়ণবীস ও গডকড়ীর রাজনৈতিক ঘাঁটি নয়, আরএসএসের সদর দফতরও এখানে অবস্থিত। ফলে এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের জয়কে প্রতীকী রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবেও দেখছে বিরোধীরা।
মহারাষ্ট্র বিধান পরিষদের পাঁচটি আসনের নির্বাচনে মহাবিকাশ আঘাড়ি তিনটি আসন পেয়েছে। বিজেপি ও তার সহযোগীরা পেয়েছে দু’টি। ফলে সামগ্রিক ফলাফলও বিরোধীদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
তবে নাগপুরের একটি নির্বাচনী ফলাফল দিয়ে গোটা মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক হবে না। কিন্তু বিজেপির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে পর পর দু’বার কংগ্রেসের জয় যে গেরুয়া শিবিরের কাছে সতর্কবার্তা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এবার নিজেদের সংগঠনের অসন্তোষ মিটিয়ে নাগপুরে হারানো জমি পুনরুদ্ধার করাই বিজেপির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।




