নয়াদিল্লি: আইডিবিআই ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণ নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর প্রশ্ন, যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক কর্মীদের পরিশ্রমে লোকসান কাটিয়ে বিপুল মুনাফার মুখ দেখেছে, সেই প্রতিষ্ঠানকে কেন কানাডার সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছে মোদী সরকার? কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা, সংরক্ষণনীতি এবং আমানতকারীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। এ বার পাল্টা আক্রমণে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তাঁর দাবি, কংগ্রেস জমানায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ঋণ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই সব ঋণ অনাদায়ী হয়ে আইডিবিআই ব্যাঙ্ককে কার্যত রুগ্ণ করে দিয়েছিল। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধন ঢেলে এবং পেশাদার পরিচালনার মাধ্যমে ব্যাঙ্কটির হাল ফেরানো হয়েছে।
শুক্রবার সমাজমাধ্যমে রাহুলের অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে নির্মলা বলেন, কংগ্রেস সরকারগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকা ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাঙ্ককর্মীদের উপর চাপ তৈরি করা হত। ঋণ দেওয়ার স্বাভাবিক নিয়মকানুনও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তাঁর।
আইডিবিআই ব্যাঙ্কের প্রসঙ্গে নির্মলা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন ভিডিয়োকন, উইনসাম, এবিজি শিপইয়ার্ড এবং কিংফিশারের নাম। তাঁর দাবি, কংগ্রেস নেতাদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত একাধিক বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই ঋণ অনাদায়ী হয়ে ব্যাঙ্কের বিপুল ক্ষতি হয়। নির্মলার কথায়, “আইডিবিআই ব্যাঙ্ক আমাদের হাতে এসেছিল অত্যন্ত খারাপ অবস্থায়।” তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস আমলের সেই আর্থিক দুরবস্থার দায় এড়িয়ে এখন ব্যাঙ্কের কর্মীদের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন রাহুল।
‘ফোন ব্যাঙ্কিং’-এর অভিযোগ নির্মলার
কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানাতে গিয়ে অতীতের একাধিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। ১৯৫৭ সালে হরিদাস মুন্দ্রার কাছে এলআইসির অর্থ পৌঁছনোর ক্ষেত্রে কংগ্রেস নেতাদের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন তিনি। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন স্টেট ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান আর কে তলওয়ারকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেছেন নির্মলা। তাঁর দাবি, সঞ্জয় গান্ধীর ঘনিষ্ঠ একটি সংস্থার ঋণের শর্ত শিথিল করার জন্য রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে চাননি তলওয়ার।
এ ছাড়াও, মারুতির জন্য ঋণ পাইয়ে দিতে সঞ্জয় গান্ধী সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার উপর চাপ তৈরি করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন অর্থমন্ত্রী। আশির দশকে তৎকালীন অর্থ প্রতিমন্ত্রী বি জানার্ধন পুজারির বিরুদ্ধেও ব্যাঙ্ককর্মীদের ঋণ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। ইউপিএ সরকারের আমলে তৎকালীন মন্ত্রী পবন বনসলের বিরুদ্ধে নিজের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায় ঋণ পাইয়ে দিতে কানাড়া ব্যাঙ্কের উপর প্রভাব খাটানোর অভিযোগও করেছেন নির্মলা।
এই গোটা ব্যবস্থাকে ‘ফোন ব্যাঙ্কিং’ বলে কটাক্ষ করেছেন তিনি। নির্মলার বক্তব্য, কংগ্রেস জমানায় প্রভাবশালীদের জন্য ছিল ফোনের নির্দেশ, আর সাধারণ মানুষের জন্য ছিল নিয়মের বেড়াজাল। তাঁর দাবি, মোদী সরকারের আমলে সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়েছে। এখন সাধারণ মানুষ সহজে ঋণ পাচ্ছেন এবং কোনও রাজনৈতিক ফোনের চাপে ব্যাঙ্ককর্মীদের ঋণ মঞ্জুর করতে হচ্ছে না।
রাহুলের প্রশ্ন, লাভের মুখ দেখেও কেন বিক্রি ব্যাঙ্ক?
বৃহস্পতিবার আইডিবিআই ব্যাঙ্কের কর্মীদের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিলেন রাহুল। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেসের আমলে দেশের শিল্প ও পরিকাঠামোর উন্নয়নের জন্য আইডিবিআই তৈরি হয়েছিল। আর মোদী সরকারের আমলে সেই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানই বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।
রাহুলের দাবি, সাত বছর আগেও আইডিবিআই ব্যাঙ্ক লোকসানে চলছিল। কিন্তু কর্মীদের পরিশ্রমে গত অর্থবর্ষে ব্যাঙ্কটি ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি মুনাফা করেছে। তাঁর কথায়, এই ঘুরে দাঁড়ানোর কৃতিত্ব ব্যাঙ্কের কর্মীদের। তা হলে যে প্রতিষ্ঠানকে কর্মীরা কঠিন পরিস্থিতি থেকে লাভজনক জায়গায় নিয়ে এসেছেন, সেটি বিক্রি করার প্রয়োজন কী?
চিঠিতে রাহুল আরও জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের মার্চে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের এক দল কর্মী সংসদ ভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, যে ব্যাঙ্ককে তাঁরা লাভজনক করেছেন, সেটি কেন বিক্রি করা হচ্ছে? কর্মী ও আমানতকারীদের স্বার্থ কী ভাবে সুরক্ষিত থাকবে? সেই প্রশ্ন তিনি লোকসভাতেও তুলেছিলেন বলে জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর অভিযোগ, সরকার কোনও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়নি।
রাহুলের আরও আশঙ্কা, বেসরকারিকরণের ফলে তফসিলি জাতি, জনজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষণের সুযোগ ধাক্কা খেতে পারে। ব্যাঙ্কের কর্মীদের চাকরির শর্ত, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তাঁর বক্তব্য, সরকারি অর্থে তৈরি প্রতিষ্ঠান আসলে দেশের মানুষের সম্পদ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ককে শুধু বিক্রির সম্পদ হিসাবে দেখলে চলবে না, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কানাডার সংস্থার হাতে ৬০.৭২ শতাংশ অংশীদারি
আইডিবিআই ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই বড় পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। কানাডার ফেয়ারফ্যাক্স ফিনানশিয়াল হোল্ডিংসের হাতে ব্যাঙ্কটির ৬০.৭২ শতাংশ অংশীদারি বিক্রির সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। এই লেনদেনের মূল্য প্রায় ৫২,৮৭৮ কোটি টাকা।
এই চুক্তিতে কেন্দ্রের হাতে থাকা ৩০.৪৮ শতাংশ এবং জীবন বিমা নিগম বা এলআইসির হাতে থাকা ৩০.২৪ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করা হবে। অর্থাৎ, দুই পক্ষ মিলিয়ে নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারি চলে যাবে ফেয়ারফ্যাক্সের হাতে। লেনদেন সম্পূর্ণ হলে কেন্দ্রের হাতে থাকবে ১৫ শতাংশ এবং এলআইসির হাতে থাকবে ১৯ শতাংশ শেয়ার। বর্তমানে কেন্দ্র ও এলআইসি মিলিয়ে ব্যাঙ্কটির প্রায় ৯৫ শতাংশ অংশীদারি নিয়ন্ত্রণ করে।
প্রতি শেয়ারের দর নির্ধারিত হয়েছে ৮১ টাকা। স্বাধীন মূল্যায়নকারী সংস্থাগুলির নির্ধারিত ন্যায্য মূল্য ছিল ৭৫.৯৯ টাকা। কেন্দ্রের দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনেই দরপত্রের কাজ হয়েছে। বিনিয়োগ ও সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা দফতর বা ডিআইপিএএম জানিয়েছে, দ্বিতীয় দফার দরপত্রের পদ্ধতি নির্ধারণ করেছিল সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কমিটি। প্রথম দফার দরপত্র অনুমোদিত না হওয়ায় নতুন করে ‘বেস্ট অফার রাউন্ড’ আয়োজন করা হয়।
২৫ হাজার কোটি ঢেলে ব্যাঙ্কের ঘুরে দাঁড়ানোর দাবি
নির্মলার দাবি, আইডিবিআই ব্যাঙ্ককে আর্থিক সঙ্কট থেকে বার করে আনতে মোদী সরকার ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধন জুগিয়েছে। পেশাদার পরিচালনা, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং অনাদায়ী ঋণ উদ্ধারের মাধ্যমে ব্যাঙ্কের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানটি বৃদ্ধির পরবর্তী পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত বলেও দাবি করেছেন তিনি।
আইডিবিআই ব্যাঙ্ক এক সময়ে বিপুল অনাদায়ী ঋণের চাপে পড়েছিল। ২০১৯ সালে এলআইসি ব্যাঙ্কটির নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারি অধিগ্রহণ করে। পরে মূলধন জোগান এবং ঋণ উদ্ধারের উদ্যোগে ব্যাঙ্কটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রম্পট কারেক্টিভ অ্যাকশন বা পিসিএ কাঠামো থেকেও বেরিয়ে আসে প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে আইডিবিআই ব্যাঙ্কের বিক্রি নিয়ে বিতর্ক এখন আর শুধু একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ভবিষ্যৎ ঘিরে আটকে নেই। এক দিকে কেন্দ্রের দাবি, অতীতের অনিয়ম ও অনাদায়ী ঋণের বোঝা থেকে ব্যাঙ্ককে উদ্ধার করে নতুন বৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্য দিকে বিরোধীদের প্রশ্ন, যে ব্যাঙ্ক এখন লাভ করছে, তার নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন কী? কর্মীদের অধিকার, সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সামাজিক ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। আইডিবিআইকে ঘিরে এই বিতর্কে তাই পুরনো ঋণ-কেলেঙ্কারির অভিযোগের পাশাপাশি সামনে চলে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মালিকানা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াই।




