প্রতিদিনের স্কুলজীবনে সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যগুলির একটি— শিক্ষক বা শিক্ষিকা একে একে পড়ুয়াদের নাম ডাকছেন, আর তারা জবাব দিচ্ছে, ‘প্রেজেন্ট স্যার’ বা ‘প্রেজেন্ট ম্যাম’। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই রুটিনে এবার আনলেন অভিনব বদল। এক শিক্ষিকার সৃজনশীল উদ্যোগে আর নাম ডেকে উপস্থিতি নেওয়ার দরকার পড়ছে না। ক্লাসে ঢুকেই নিজের উপস্থিতি নিজেই নথিভুক্ত করছে পড়ুয়ারা। সেই অভিনব ব্যবস্থার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন নেটিজেনরা।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, শ্রেণিকক্ষের প্রবেশপথের ঠিক পাশে একটি বড়, রঙিন ‘সেলফ অ্যাটেনডেন্স বোর্ড’ টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। বোর্ডে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর জন্য আলাদা আলাদা নাম বা নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। ক্লাসে ঢোকার সময় পড়ুয়ারা নিজেরাই সেখানে চুম্বক, স্টিকার বা পরিচয়চিহ্ন বসিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে যে তারা উপস্থিত। ফলে শিক্ষককে আর একে একে নাম ডেকে সময় নষ্ট করতে হচ্ছে না।
প্রথম দেখায় বিষয়টি যতটা সাধারণ মনে হয়, শিক্ষাবিদদের মতে এর শিক্ষামূলক গুরুত্ব ততটাই গভীর। কারণ এই পদ্ধতিতে শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। নিজের উপস্থিতির দায়িত্ব নিজেই নেওয়া, নিয়ম মেনে কাজ করা এবং প্রতিদিনের অভ্যাস গড়ে তোলার মতো মূল্যবোধও অজান্তেই শেখানো যায় এই ব্যবস্থার মাধ্যমে। একই সঙ্গে শিক্ষকও ক্লাসের শুরুতেই পাঠদানে বেশি সময় দিতে পারেন।
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই নেটমাধ্যমে শুরু হয়েছে প্রশংসার ঝড়। কয়েক লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যেই ভিডিওটি দেখেছেন। কেউ লিখেছেন, “এটাই প্রকৃত অর্থে স্মার্ট ক্লাসরুম।” আবার কারও মন্তব্য, “শিশুদের দায়িত্বশীল করে তোলার এর চেয়ে সহজ এবং সুন্দর উপায় আর হয় না।” অনেকেই মনে করছেন, এমন উদ্যোগ দেশের বিভিন্ন স্কুলে চালু করা হলে পড়াশোনার পরিবেশ আরও আনন্দময় হয়ে উঠবে।
শুধু উপস্থিতি নেওয়ার নতুন কৌশল নয়, এই উদ্যোগে লুকিয়ে রয়েছে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। মুখস্থ পড়াশোনার বাইরে গিয়ে এখন শিশুদের আত্মনির্ভরতা, অংশগ্রহণ এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতা গড়ে তোলার উপর জোর দিচ্ছেন শিক্ষকরা। সেই ভাবনারই এক বাস্তব রূপ এই ‘সেলফ অ্যাটেনডেন্স বোর্ড’।
অনেক শিক্ষকের মতে, প্রতিদিন কয়েক মিনিট করে উপস্থিতি নেওয়ার যে সময় নষ্ট হয়, তা বাঁচিয়ে সেই সময় পড়াশোনা, গল্প, আলোচনা বা অন্য সৃজনশীল কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। পাশাপাশি পড়ুয়ারাও ক্লাসের শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে শেখে।
একটি ছোট্ট পরিবর্তন যে কত বড় প্রভাব ফেলতে পারে, এই ভাইরাল ভিডিও যেন সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিল। প্রযুক্তির যুগে শিক্ষার ধরনও বদলাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে এমন সব শিক্ষক-শিক্ষিকা, যাঁরা নতুন ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শেখার প্রক্রিয়াকে আরও আনন্দদায়ক, অংশগ্রহণমূলক এবং অর্থবহ করে তুলছেন।