বিশেষ প্রতিবেদন: ছোটবেলায় বই, সংবাদপত্র কিংবা রেডিও, কোনওটাই ছিল না বাড়িতে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী সমাজব্যবস্থায় দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়ে ওঠা এক কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে একদিন পৌঁছে গেলেন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে। সেই মেয়েই নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতে আজ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই দক্ষিণ আফ্রিকান আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মী।
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, নাভি পিল্লাইয়ের নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
ডারবানের বস্তি থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে
নাভি পিল্লাইয়ের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে, এক তামিল বংশোদ্ভূত ভারতীয় পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন বাসচালক এবং মা ছিলেন গৃহিণী, যিনি নিজেই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ছিল শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস। তাঁর মাতামহকে ব্রিটিশ চিনি বাগানের শ্রমিক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ অবস্থায় দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে আসা হয়েছিল।
বর্ণবিদ্বেষের সময়ে একজন দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছিল কার্যত অসম্ভবের সমান। নাভির পরিবারের অনেকেই তাঁর স্বপ্নকে প্রথমে গুরুত্ব দেননি। এক শিক্ষিকাও প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁর বাবা কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো যথেষ্ট অর্থের জোগান দিতে পারবেন?
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাশে দাঁড়ায় তাঁর সম্প্রদায়। এলাকার মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য টাকা দিয়ে তাঁর উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাড় করতে সাহায্য করেন। সেই সহযোগিতাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
আইনজীবী হওয়ার পথেও বর্ণবিদ্বেষের বাধা
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পরেও সহজ হয়নি তাঁর পথ। মাত্র ২৪ বছর বয়সে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করতে গিয়ে একের পর এক বাধার মুখে পড়েন তিনি। সেই সময় অধিকাংশ আইন সংস্থাই শ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাঁর গায়ের রং, আর্থিক অবস্থান এবং নারী পরিচয় তিনটিই তাঁর পেশাগত জীবনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
নাভি পিল্লাই পরবর্তী সময়ে জানিয়েছিলেন, কীভাবে তাঁর পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, আইন সংস্থার জন্য ব্যবসা নিয়ে আসার ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে সন্তানধারণের সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি তুলনা করেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার প্রাথমিক পেশাগত জীবনের। ম্যান্ডেলাকেও আইনজীবী হওয়ার পথে বর্ণবিদ্বেষের অপমান সহ্য করতে হয়েছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জ
দীর্ঘ সংগ্রামের পর নাভি পিল্লাই দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন ১৯৯৫ সালে। একই বছর তিনি রুয়ান্ডার গণহত্যা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি নির্বাচিত হন। সেখানে আট বছর কাজ করেন, যার মধ্যে চার বছর ছিলেন ট্রাইব্যুনালের সভাপতি।
এই ট্রাইব্যুনালে তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরিতে সাহায্য করে। বিশেষত, ধর্ষণকে গণহত্যার একটি পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।
২০০৩ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারপতি হন। পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নারী অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক সংগঠন Equality Now প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নোবেল সম্মান?
নাভি পিল্লাইয়ের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। দারিদ্র্য, বর্ণবিদ্বেষ ও লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার কাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাই তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম পরিচয়। ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার সেই কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শৈশবে যাঁর আইনজীবী হওয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল, আজ তাঁর নামই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ইতিহাসে বিশেষভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। নাভি পিল্লাইয়ের এই যাত্রা প্রমাণ করে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস এবং অধ্যবসায় জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
