কলকাতা: ধর্মীয় পরিচয় বদলানোর চাপ, প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি, নাবালিকাদের ধর্ষণের ভয় দেখানো এবং এক মহিলাকে বিবস্ত্র করে জোর করে স্নান করিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর অভিযোগ। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা থানার অন্তর্গত পাটলাপুর গ্রামে তিনটি খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলার অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযোগকারিণীর দাবি, বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন ব্যক্তি তাঁদের খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। রাজি না হওয়ায় মারধর, হেনস্থা এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
দুর্গাপুজোর সময়, ১৮ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিন ধরে তাঁদের উপর অত্যাচার চলে বলেও অভিযোগ। ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশ। অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় অন্তত ১৩ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে। তবে এদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে খবর । অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বজরং দল বা রাজ্য সরকারের বক্তব্যও এখনও স্পষ্ট নয়।
‘যিশুর উপর বিশ্বাস ছাড়তে চাপ দেওয়া হয়েছিল’
অভিযোগকারিণী পাটলাপুরের বাসিন্দা। তাঁর দাবি, গত ১৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টে নাগাদ একদল লোক তাঁর বাড়িতে ঢুকে পড়েন। তাঁদের মধ্যে কয়েক জন বজরং দলের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। অভিযোগ, তাঁরা পরিবারের সদস্যদের যিশুখ্রিস্টের উপর বিশ্বাস ত্যাগ করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এর পরেই শুরু হয় মারধর ও হেনস্থা।
অভিযোগকারিণীর বয়ান অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে রণজিৎ দোলুই নামে এক ব্যক্তি তাঁর মাথায় এবং কানের নীচে আঘাত করেন। তাতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
আংশিক জ্ঞান ফেরার পর বুঝতে পারেন, তাঁর পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েক জন তাঁর শাড়ি খুলে দিয়েছেন। অভিযোগে রণজিৎ দোলুইয়ের পাশাপাশি পচা পাত্র ও বাপি মণ্ডলের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। মহিলার দাবি, তাঁকে জোর করে স্নান করিয়ে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে অপমান করা হয়। তাঁর অভিযোগ, সেই সময়ে অন্যদের সামনেই তাঁর উপর এই অত্যাচার চালানো হয়েছিল। ঘটনাটির বিবরণ সামনে আসার পর ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযোগের প্রতিটি দিক তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
নাবালিকাদের ধর্ষণের হুমকি, বাড়ি থেকে টাকা লুটের অভিযোগ
শুধু অভিযোগকারিণী নন, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং কাছাকাছি বসবাসকারী আরও দুটি খ্রিস্টান পরিবারের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, ওই পরিবারগুলির সদস্যদের মারধর করা হয় এবং খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ না করলে ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। অভিযোগকারিণীর ১৬ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও এফআইআরে দাবি করা হয়েছে।
অন্য একটি পরিবারের ১৫ বছরের এক কিশোরীর গলা চেপে ধরে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ। দুই মহিলাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মারধরের অভিযোগও উঠেছে। একটি বাড়ির তালা ভেঙে নগদ ২০ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারিণীর দাবি, তাঁরা পুলিশের কাছে গেলে তিনটি পরিবারকেই পুড়িয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে থাকেন পরিবারের সদস্যেরা। বিশেষ করে বাড়ির নাবালিকা মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে গিয়ে ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করার অভিযোগ
অভিযোগ, ১৮ অক্টোবরের ঘটনার পর পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন ওই মহিলা। পুলিশকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর মৌখিক অভিযোগ শোনেন বলে দাবি তাঁর। কিন্তু এর পরেও হেনস্থা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ। পরের দিন, ১৯ অক্টোবর, কয়েক জন অভিযুক্ত ওই মহিলা, তাঁর স্বামী এবং আরও কয়েক জনকে পাশের ডিঙ্গল গ্রামের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে নিয়ে যান বলে অভিযোগ।
সেখানে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালন করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে দাবি অভিযোগকারিণীর। পুজোর অঞ্জলি দেওয়ার পাশাপাশি তুলসী ও বেলপাতা খাওয়ানোর অভিযোগও উঠেছে। এর পর ২০ অক্টোবর সকালে ফের তাঁদের বাড়িতে অভিযুক্তদের কয়েক জন আসেন বলে অভিযোগ। ওই মহিলার দাবি, তাঁর স্বামী তপন মণ্ডল এবং অন্য একটি পরিবারের সদস্য অশোক মণ্ডলকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
তাঁদের খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ না করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। পরিবারগুলির দাবি, এই ঘটনার পরেও তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০ অক্টোবর রাতে চন্দ্রকোনা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই অন্তত ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা রুজু করেছে পুলিশ।
১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তে পুলিশ
অভিযোগের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ, মারধর, গুরুতর আঘাত, খুনের চেষ্টা, মহিলাকে বিবস্ত্র করার উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ, চুরি এবং অপরাধমূলক ভয় দেখানোর মতো অভিযোগ। এফআইআরে ১৩ জনের নাম রয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত চলছে।
পরিবারগুলির নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অন্য একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগকারিণীর বয়ান ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে নথিভুক্ত করার পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছিল পুলিশ। তবে ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত অভিযুক্তদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি বলে এনডিটিভি জানিয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির তরফে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি উঠেছে। তিনটি পরিবারের অভিযোগ, তাঁরা নিজেদের বাড়িতে যিশুখ্রিস্টের উপাসনা করতেন। তাঁদের কোনও গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করার প্রয়োজন ছিল না। তা সত্ত্বেও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তাঁদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ অভিযোগে নাবালিকাদের বিরুদ্ধে যৌন হুমকি এবং এক মহিলাকে বিবস্ত্র করার মতো গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে। অভিযোগকারিণীর পরিবারের দাবি, তাঁরা শুধু নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার জেরেই তাঁদের উপর হামলা চালানো হয়েছে।
অন্য দিকে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। তাই ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা, অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই এখন প্রশাসনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পাটলাপুরের তিনটি পরিবারের অভিযোগ শুধু একটি গ্রামের আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, মহিলাদের মর্যাদা এবং সংখ্যালঘু পরিবারের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তদন্তে কী উঠে আসে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হয় এবং পরিবারগুলি কতটা নিরাপত্তা পায়—এখন নজর সেদিকেই।




