পঞ্জাব: মাদক পাচারের অভিযোগে এক ধর্মীয় নেতার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে হেরোইন উদ্ধারের দাবি করেছিল পুলিশ। সেই অভিযোগেই গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামনে এল এমন এক সিসিটিভি ফুটেজ, যা গোটা অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিল। অভিযোগ, পুলিশি তল্লাশির আগেই সাদা পোশাকে এক পুলিশকর্মী ওই বাড়িতে ঢুকে গদির নীচে মাদকভর্তি প্যাকেট রেখে এসেছিলেন। পরে সেই জায়গা থেকেই মাদক উদ্ধারের দাবি করে গ্রেফতার করা হয় বাড়ির মালিককে। ফুটেজ প্রকাশ্যে আসতেই অভিযুক্ত পুলিশকর্মীকে সাসপেন্ড করেছে প্রশাসন। শুধু তা-ই নয়, গোটা ঘটনার তদন্তে গঠন করা হয়েছে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)। পঞ্জাবের খন্নায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মানের সরকারকে কাঠগড়ায় তুলে সরব হয়েছে শিরোমণি অকালি দল।
ঘটনার কেন্দ্রে খন্নার শিবসেনা নেতা মহন্ত কাশ্মীর গিরি। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গিরির গাড়িচালক গুরজন্ত সিংহ ওরফে জন্তাকে প্রথমে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁর কাছ থেকে ৭.৫ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গিরির নাম সামনে আসে বলে জানায় তদন্তকারীরা। সেই সূত্র ধরেই গিরির বাড়িতে তল্লাশি চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।
কিন্তু পুলিশের সেই অভিযানের আগের মুহূর্তের একটি দৃশ্যই এখন গোটা ঘটনাকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে। গিরির বাড়িতে লাগানো গোপন ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গিয়েছে বলে দাবি, সাদা পোশাকে এক ব্যক্তি ঘরের ভিতরে ঢুকছেন। তাঁর পরিচয় এএসআই সুখদেব সিংহ বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, তিনি ঘরের একটি গদির নীচে প্যাকেটের মতো কিছু একটা রেখে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। এর কিছু ক্ষণের মধ্যেই পুলিশের একটি দল ওই বাড়িতে পৌঁছয়। তল্লাশির সময় সেই একই গদির নীচ থেকে প্রায় ৩০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। এর পরেই মাদক রাখার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় গিরিকে।
ঘটনার মোড় ঘুরে যায় সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসার পর। বাড়ির গোপন ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্য খতিয়ে দেখে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তাদের কাছে অভিযোগ জানানো হয়। ফুটেজে পুলিশের এক কর্মীর সন্দেহজনক গতিবিধি প্রকাশ্যে আসতেই তড়িঘড়ি পদক্ষেপ করে খন্না পুলিশ। অভিযুক্ত এএসআই সুখদেব সিংহকে সাসপেন্ড করা হয়। পাশাপাশি, গিরিকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খন্নার পুলিশ সুপার ডর্পণ আহলুওয়ালিয়া জানিয়েছেন, ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখতে পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে সিট গঠন করা হয়েছে। শুধু অভিযুক্ত এএসআইয়ের ভূমিকাই নয়, গিরির বাড়িতে তল্লাশি চালাতে যাওয়া গোটা পুলিশ দলের ভূমিকা খতিয়ে দেখবে তদন্তকারী দল। তল্লাশির আগে কী ঘটেছিল, কে বা কারা ওই অভিযানে যুক্ত ছিলেন এবং মাদক উদ্ধারের দাবির পিছনে কোনও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল কি না—সবই তদন্তের আওতায় আসছে।
এই ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, পুলিশের তল্লাশি ও মাদক উদ্ধারের প্রক্রিয়া কতটা নির্ভরযোগ্য? কোনও ব্যক্তিকে মাদক মামলায় গ্রেফতার করার আগে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর উৎস, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং তল্লাশির নিয়ম মেনে চলা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশেরই।
সেই পুলিশের এক কর্মীর বিরুদ্ধেই যদি মাদক রেখে ফাঁসানোর অভিযোগ ওঠে, তা হলে তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং আইনরক্ষকদের বিশ্বাসযোগ্যতা—দু’টিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ঘটনাকে হাতিয়ার করে আপ সরকারকে আক্রমণ করেছে বিরোধী শিরোমণি অকালি দল। দলের সভাপতি সুখবীর সিংহ বাদল মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মানের সরকারকে নিশানা করে অভিযোগ করেছেন, পঞ্জাবে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে। মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আপ সরকার। অথচ পুলিশের বিরুদ্ধেই যদি মাদক সাজিয়ে রেখে কাউকে ফাঁসানোর অভিযোগ ওঠে, তা হলে সেই অভিযানের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায়, প্রশ্ন তুলছে বিরোধীরা।
পঞ্জাবে মাদক সমস্যা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্বেগের বিষয়। রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে নেশার বিস্তার, মাদক পাচারের চক্র এবং সীমান্তপারের মাদক সরবরাহ নিয়ে বার বার সরব হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় আসার পর মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে আপ সরকারও। কিন্তু সেই অভিযানে যুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধেই এমন অভিযোগ ওঠায় নতুন করে অস্বস্তিতে শাসক শিবির।
তবে সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সিটের তদন্তের অপেক্ষা জরুরি। অভিযুক্ত পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, তল্লাশিতে অংশ নেওয়া অন্য আধিকারিকদের ভূমিকা এবং উদ্ধার হওয়া মাদকের প্রকৃত উৎস—সব দিকই খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তা হলে বিষয়টি শুধু এক পুলিশকর্মীর অসদাচরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানোর অভিযোগে গোটা পুলিশি ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠবে।




