'ধর্ম আমার আমি নিজে বেছে নিইনি/পদবিতে ছিল না যে হাত
মসজিদে যেতে হয়,তাই জোর করে যাই/বচ্ছরে দু'এক বার
তাও যদি বলতাম হিন্দুর ছেলে আমি/ নীলু,বিলু কিংবা নিতাই
মিথ্যে কথা আমি বলতে যে পারিনা/ভ্যা ভ্যা ভ্যাবাচ্যাকা খাই!'
যারা নব্বইয়ের দশকে কিশোরবেলা পেরিয়ে তারুণ্যের দোরগোড়ায় পা রেখেছিলেন তারা জানেন এই গানের কথাগুলি কার লেখা? তিনিই আরও বেশকিছু বছর পেরিয়ে একটা সিনেমা পরিচালনা করলেন। সেখানে তিনি একটি ব্যান্ডের সদস্য, ধর্মে মুসলিম এক তরুণ কে ধর্মের 'সহজ পাঠ' শেখালেন। তিনি বললেন - 'ধর্ম মানে আজান, কাওয়ালি, কীর্তন-সংকীর্তন, ক্যারলস।এক কথায় ধর্ম মানে শিল্প।' তিনি অঞ্জন দত্ত। আসলে ধর্ম মানে যা ধারন করা হয়। লজ্জা ঢাকতে জামা-কাপড় পরি, জামাকাপড় হল ধর্ম; লজ্জা নিবারণের ধর্ম! খিদে পেলে খাই - খাওয়াটা ধর্ম, খিদে মেটানোর ধর্ম। ধর্ম মানে স্রেফ দূর্গা-পয়গম্বর-যীশু-নানক-বুদ্ধ নন।
এইকথা অঞ্জন দত্তেরও আগে বলে গেছেন এক বাঙালি মুসলিম কবি - ‘মিথ্যে শুনিনি ভাই/এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই’। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলে গেছেন 'ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/ অন্ধ সে জন শুধু মারে আর মরে।' তিনি ধর্মে ছিলেন ব্রাহ্ম,একেশ্বরবাদী।তাঁকে প্রেরণা জুগিয়েছিল উপনিষদ - 'ঈশা বাসমিদং সর্বং,যদকিঞ্চদ জগত্যাং জগত/তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিতা মা গৃদ্ধ কস্যসিদ্ধনম।' তাঁকে জুড়ে রইলেন এক মুসলিম,'অশিক্ষিত' ফকির। যাঁর দেওয়া শিক্ষা ছড়িয়ে গেল বিশ্বময় -
'জগৎ বেড়ে জাতের কথা/ লোকে গল্প করে যথা তথা
লালন বলে জাতের কী রূপ/দেখলাম না এই নজরে!
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে?
জাত-ধর্ম-বর্ণ: বিভেদের মুদ্রার অন্য পিঠ! ধর্মীয় মৌলবাদ যে কোন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। সে ধর্মীয় মৌলবাদের নাম হতে পারে হিন্দু আগ্রাসন অথবা মুসলিম একাধিপত্য।অথচ কী আশ্চর্য, 'বিবিধের মাঝে মিলন মহান' হয়ে,' সেক্যুলার' তকমা এঁটে; আপন গরিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল ভারত! কারো সাধ্য হলনা সে তকমা কেড়ে নেওয়ার। বর্তমান শাসক বহু চেষ্টা করছে বটে, একটিমাত্র ধর্মের তাঁবে এই 'সোনার দেশ'কে আনার; তবে সেই প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে কী না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেই। মৌলবাদ - যা প্রতিরোধ করতে গিয়ে বলি হয়ে গেছেন সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ।
তবে ধান ভানতে শিবের গীত গেয়ে লাভ নেই। আসল ঘটনা আপনাদের জানানো যাক। বাংলাদেশের নাটোরের লালপুরে, উপজেলা বাকনাইতে এক হিন্দু বাড়িতে একটি চিঠি যায়। সেই চিঠিতে কুড়িহাজার টাকা দিতে হবে, দাবি জানানো হয়। আরো বলা হয়, কাউকে জানালে তাদের পরিবারের সদস্যদের লাশ রাস্তায় পড়ে থাকবে। সেখানে স্পষ্ট দাবি প্রতিটি হিন্দু পরিবারকে এই চাঁদা দিতে হবে। যারা, বলা ভাল যে হিন্দু পরিবার এই চিঠি পায়নি, তাদের জানিয়ে দিতে হবে। এই ঘটনা মনে করাচ্ছে সুলতানি যুগের জিজিয়া করের স্মৃতি। ধর্মের নামে যা দিতে হত হিন্দুদের। সেই হুমকি চিঠি জুড়ে ব্যাপক শোরগোল ওই অঞ্চলে। নাম উঠে আসছে সেভেন স্টার নামে এক ক্লাবের। যা মুসলিম ধর্মাবলম্বী লোক দ্বারা অধ্যুষিত।
আপনাদের জানা আছে, এই বাংলাদেশে 'মুক্তমনা ব্লগার' অভিজিৎ - যাকে মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন বলে, কোপানো হয়েছিল রাস্তায় ফেলে, কেটে নেওয়া হয় মাথা। দীপু দাস নামে পোশাক-শ্রমিক - যাকে জ্যান্ত পোড়ানো হয়েছিল স্রেফ হিন্দু হওয়ার অপরাধে! অথবা তসলিমা নাসরিনের কথা ভুলে যাননি তো? তাকে নির্বাসন কেন দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার? মনে আছে নিশ্চয়ই। তসলিমা এই দুদিন আগেই কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করলেন।
তাহলে মূল ঘটনা কী দাঁড়াল? গৌরী লঙ্কেশ থেকে তসলিমা, অভিজিৎ থেকে দীপু দাস- মৌলবাদের আগুনে পেট ক্রমেই গ্রাস করছে লালন সাঁইয়ের শিক্ষা-'
কেউ মালা কেউ তসবী গলে/তাই কিরে জাত ভেন্ন বলে
যাওয়া কিংবা আসার বেলায়/ সেই জাতের চিহ্ন রয় কারে!
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে?
মাপ করে দিও সাঁইজি,আমরা তোমার গানটা নিলাম। শিক্ষাটা নিতে পারলাম না!




