কিছু মানুষ মৃত্যুর পরও মৃত হন না। তাঁদের শরীরের প্রস্থান ঘটে, অথচ তাঁদের চারপাশে জমে থাকা সময়টি হঠাৎ থেমে যায় না। বরং আরও গভীর কোনও স্তরে গিয়ে তাঁদের অস্তিত্বের অনুরণন শুরু হয়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তেমনই এক অনুরণনের নাম, যাঁর প্রস্থান একটি জীবনের সমাপ্তি হলেও, একটি মননের নয়। তিনি চলে গিয়েছিলেন এক বর্ষণমুখর ঋতুর প্রান্তে। অথচ তাঁর চলে যাওয়ার পরও বাংলার আকাশে কিছু মেঘ যেন থেকে গিয়েছিল, যে মেঘ বৃষ্টি হয়ে নামে না, স্মৃতি হয়ে জমে থাকে।
বুদ্ধদেব বাবুকে মনে করলে রাজনীতির চেনা শব্দাবলি দিয়ে তাঁকে সম্পূর্ণ ধরা যায় না। কারণ তাঁর ভিতরে একই সঙ্গে বাস করত দুটি বিপরীত ভূগোল! একদিকে ক্ষমতার কঠিন, নিরাবেগ পৃথিবী; অন্যদিকে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা এক নিভৃত, সংবেদনশীল মন। দিনের আলোয় তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের মানুষ, অথচ তাঁর অন্তর্গত সন্ধ্যাগুলি ছিল কবিতা, নাটক, সাহিত্য আর একান্ত আত্মসংলাপের।
সম্ভবত তিনি জানতেন, রাষ্ট্রের আয়ু দীর্ঘ, ক্ষমতার স্মৃতি ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু একটি কবিতার সত্য কখনও কখনও একটি যুগের চেয়েও দীর্ঘজীবী। তাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ছবিটি হয়তো কোনও রাজনৈতিক সভায় নয়। হয়তো সেটি একটি অন্ধকার ঘরে। বাইরে তখন শহর তার সমস্ত কোলাহল নিয়ে ছুটে চলেছে। গাড়ির আলো, মানুষের ব্যস্ততা, সংবাদপত্রের উত্তাপ, ক্ষমতার হিসাব, সবকিছু নিজের নিয়মে প্রবাহিত। আর সেই সমস্ত শব্দের থেকে সামান্য দূরে, একটি মানুষ বইয়ের পাতা উল্টে চলেছেন। যেন পৃথিবীর সমস্ত তর্ক থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজেকে সরিয়ে তিনি শব্দের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন।
এই নৈঃসঙ্গ্যই হয়তো তাঁকে আলাদা করেছিল। তিনি ছিলেন এমন এক সময়ের সন্তান, যখন আদর্শ শব্দটি এখনও অভিধানে তার পূর্ণ অর্থ হারায়নি; যখন রাজনীতি ছিল বিশ্বাসেরও একটি নাম, আবার বিরোধিতারও; যখন সাহিত্য ছিল নিছক বিনোদন নয়, মানুষের আত্মপরিচয়ের এক গোপন দরজা। সেই সময়ের আলো-অন্ধকার, সাফল্য-ব্যর্থতা, স্বপ্ন-ভঙ্গ, সবকিছুর ভিতর দিয়েই তাঁর পথচলা।
তাঁকে নিয়ে ইতিহাস একদিন তার নিরপেক্ষ বিচার লিখবে। লিখবে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা, তাঁর সাফল্যের কথা, তাঁর ভুলের কথাও। ইতিহাসের কাছে কেউই সম্পূর্ণ নির্দোষ নয়, সম্পূর্ণ নির্ভুলও নয়। কিন্তু ইতিহাসের পাদটীকা পেরিয়ে মানুষকে যে জায়গাটিতে পাওয়া যায়, সেখানে বুদ্ধদেব ছিলেন অন্যরকম। সেখানে তিনি কোনও পদবি নন। কোনও রাজনৈতিক পরিচয় নন। তিনি একজন পাঠক।
একজন মানুষ, যিনি জানতেন বইয়ের ভিতরেও একটি পৃথিবী থাকে, যে পৃথিবীতে পরাজিত মানুষও কথা বলে, নীরবতাও ভাষা পায়, আর অন্ধকারের মধ্যেও কোনও অদৃশ্য জানলা দিয়ে আলো এসে পড়ে। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাই মনে হয়, তাঁর মৃত্যু আসলে একটি দীর্ঘ বাক্যের শেষে দাঁড়ি নয়; বরং এমন একটি অসমাপ্ত কমা, যার পরবর্তী শব্দগুলি হয়তো সময় নিজেই লিখে চলেছে।
বছর পেরোয়। মুখ বদলায়। শহরের দেওয়ালে নতুন পোস্টার ওঠে, পুরনো পোস্টার খসে পড়ে। রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, ইতিহাসের ব্যাখ্যাও বদলে যায়। কিন্তু মানুষের ভিতরে যে প্রশ্নগুলি সত্যিই গভীর, মানুষ কীভাবে বাঁচবে, কীসে তার মর্যাদা, সংস্কৃতি কোথায়, স্বপ্নের মূল্য কতখানি? সেই প্রশ্নগুলির কোনও অবসর নেই। সেই অনন্ত প্রশ্নের পাশে কোথাও না কোথাও বুদ্ধদেবের ছায়া থেকে যায়।
তাঁর চলে যাওয়ার পর বাংলার আকাশ আরও একটু নিঃশব্দ হয়েছে কি না, তা বলা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়, একটি কণ্ঠ থেমে যাওয়ার পরও তার প্রতিধ্বনি অনেক দূর পর্যন্ত যায়। যেমন সূর্য অস্ত যায়, অথচ পশ্চিম আকাশ সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার হয় না। আলোর শেষ রেশটুকু অনেকক্ষণ থেকে যায়। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও তেমনই এক অস্তগামী আলোর দীর্ঘতম স্মৃতি। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে সেই আলোকে প্রণাম।