দীর্ঘ দেড় দশক তৃণমূলের শাসনকালেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত বামপন্থীদের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার সেই বামদুর্গে সংগঠন বিস্তারের লক্ষ্যে সক্রিয় হয়েছে বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে খুলেছে আরএসএসের শাখা। পাশাপাশি কর্মচারী, শিক্ষক এবং ছাত্র সংগঠনগুলির মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার উদ্যোগও শুরু করেছে গেরুয়া শিবির। আর সেই প্রচেষ্টাকে ঘিরেই রংবদলের সিঁদুরে মেঘ দেখছে যাদবপুর।
গত ১২ মে, বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার মাত্র আট দিনের মাথায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় আরএসএসের শাখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মী পলাশ মাজির দাবি, প্রতিদিন সকাল সাড়ে ছ'টা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত শাখা পরিচালিত হচ্ছে এবং বর্তমানে প্রায় ২৫ জন স্বয়ংসেবক নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন। তাঁদের অধিকাংশই কর্মচারী ও ছাত্র। যদিও এখনও কোনও অধ্যাপক আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হননি, তবে কয়েকজন শিক্ষক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা শাখায় উপস্থিত থাকছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
শুধু শাখা পরিচালনাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য পৃথক ঘরের আবেদন জানিয়েছে বিজেপি-সমর্থিত বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী পরিষদ, বিএমএস অনুমোদিত কর্মচারী সংগঠন এবং শিক্ষক সংগঠন এবিআরএসএম। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথমে ঘর বরাদ্দ করলেও পরে ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর আপত্তির জেরে সেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা হয়। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য এস্টেট বিভাগকে অন্য ভবনে ঘর দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ তুলেছে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলি।
এসএফআই-এর দাবি, কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সংগঠনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক চত্বরে অফিসের জন্য জায়গা দেওয়া উচিত নয়। সংগঠনের কলকাতা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সৌরদীপ সামন্ত বলেন, ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত একাডেমিক ভবনে রাজনৈতিক সংগঠনের ইউনিয়ন রুম থাকা সমীচীন নয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম রাজনীতির ইতিহাস বহু দশকের। ষাটের দশক থেকে উদ্বাস্তু আন্দোলন, ছাত্র রাজনীতি এবং নকশাল আন্দোলনের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী এই ক্যাম্পাস। বহু বছর ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়টি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে জাতীয়তাবাদ বনাম বামপন্থী রাজনীতি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে যাদবপুর। 'আজাদ কাশ্মীর' লেখা দেওয়াল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে ঘিরে বিক্ষোভ কিংবা এবিভিপি-র ছাত্রদের বয়কট— একাধিক ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানোকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অশান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা সুরঞ্জন সরকার দাবি করেন, এরপর তাঁকে দীর্ঘদিন ক্লাসে একঘরে করে রাখা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, তিনি ক্লাসে ঢুকলেই অন্য ছাত্ররা বেরিয়ে যেত এবং অনেক শিক্ষকও অন্য ঘরে গিয়ে পাঠদান করতেন। বর্তমানে সুরঞ্জন বিজেপি যুব মোর্চার অন্যতম মুখ।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন জুটা অবশ্য নিজেদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষ বলেই দাবি করেছে। সংগঠনের সম্পাদক রাজেশ্বর সিংহ জানিয়েছেন, জুটা কোনও রাজনৈতিক দলের সংগঠন নয় এবং বিভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষক সেখানে রয়েছেন। ফলে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
এদিকে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ সংগঠনগুলির অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাংশ এখনও বামপন্থী সংগঠনগুলির প্রতি নরম মনোভাব দেখাচ্ছে। সম্প্রতি একটি সেমিনারের জন্য প্রেক্ষাগৃহ বরাদ্দ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হিন্দু জাগরণ মঞ্চের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন দ্রুত অনুমতি দেয়নি। যদিও এ বিষয়ে উপাচার্য বা রেজিস্ট্রারের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও মেলেনি।
সব মিলিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আপাতত বড় কোনও সংঘর্ষ না হলেও রাজনৈতিক টানাপোড়েন স্পষ্ট। একদিকে বাম সংগঠনগুলির দাবি, সরকারি ক্ষমতার জোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চরিত্র বদলানোর চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠনগুলির বক্তব্য, এতদিন যাদবপুরে একপাক্ষিক রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল, এখন মতের বহুত্বই প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।