এটিএম সাধারণত টাকা তোলার একটি মেশিন। নির্দিষ্ট তথ্য দিলে এটিএম থেকে টাকা বের হয়। তবে পূর্ব মেদিনীপুরের টাকার বদলে এটিএম থেকে বেরোচ্ছে স্যানিটারি ন্যাপকিন। শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবে এই কাজ করে দেখিয়েছেন একদল যুবক।
মহিলাদের স্বাস্থ্যরক্ষায় স্যানিটারি ন্যাপকিন অত্যন্ত জরুরি হলেও প্রত্যন্ত এলাকায় এ নিয়ে এখনও অনেক ছুঁতমার্গ রয়েছে। দোকানে গিয়ে ন্যাপকিন চাইতে আজও সংকোচ বোধ করেন গ্রামের অনেক মহিলা। এই জড়তা কাটাতে এবং মহিলাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে এবার এক অভিনব উদ্যোগ দেখা গেল পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নায়। সেখানে রাস্তার ধারের একটি এটিএম থেকে টাকার বদলে বেরোচ্ছে স্যানিটারি প্যাড।
সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে এই প্যাড এটিএমের একটি ভিডিও ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে, যা ইতিমধ্যেই সাড়ে সাত লক্ষেরও বেশি মানুষ দেখেছেন। অনেকেই এই পরিষেবার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। রাজ্যে এ ধরনের স্যানিটারি প্যাড এটিএম তৈরির ঘটনা সম্ভাব্য এটাই প্রথম।
পূর্ব মেদিনীপুরের রামচক গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত দোনাচক গ্রামে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ স্যানিটারি ন্যাপকিন পরিষেবা কেন্দ্র বা প্যাড এটিএম। প্রত্যন্ত গ্রামে এই উদ্যোগ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। এই অভিনব উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন গ্রামেরই কয়েকজন যুবক। ময়নার দোনাচক স্বামী বিবেকানন্দ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এটি বাস্তবায়িত হয়েছে।
সংস্থার সম্পাদক শুভদীপ ভৌমিক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চেষ্টায় প্রত্যন্ত গ্রামের রাস্তার ধারে এমন একটি এটিএম তৈরি হওয়ায় পথচলতি মানুষ রীতিমতো অবাক হচ্ছেন, অনেকেই আবার দাঁড়িয়ে দেখছেন। কিন্তু হঠাৎ করে এমন প্যাড এটিএম তৈরির ভাবনা এল কোথা থেকে?
শুভদীপরা জানাচ্ছেন, ২০১৩ সাল থেকেই তারা এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কাজ করে আসছেন। সেই সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে মহিলাদের সঙ্গে কথা বলে তারা বুঝতে পারেন, আধুনিক যুগেও ঋতুকালীন স্বাস্থ্য নিয়ে গ্রামের মেয়েরা একেবারেই সচেতন নন। লজ্জায় অনেকেই দোকান থেকে ন্যাপকিন কিনে আনতে বলতে পারেন না। অপরিষ্কার থাকার ফলে মহিলাদের জরায়ুমুখের ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
এরপর ২০১৭ সাল থেকে ওই যুবকেরা এলাকার দোকানগুলোতে সমীক্ষা শুরু করেন। তারা দেখেন, কেউ ন্যাপকিন কিনতে এলে আজও তা কালো কাগজে মুড়ে দেওয়া হয়। এই ভুল ধারণা ও ছুঁতমার্গ দূর করতেই তারা কোমর বেঁধে নামেন।
প্রথম দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং বিভিন্ন গ্রামে শিবির করে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ শুরু করেন এই যুবকেরা। পাশাপাশি ব্যবহৃত ন্যাপকিন যত্রতত্র না ফেলার বিষয়েও প্রচার চালানো হয়। ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক, আশাকর্মী ও পঞ্চায়েত সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে মহিলাদের ন্যাপকিন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো শুরু হয়।
এরপর ময়না ও পিংলার বিভিন্ন সরকার পোষিত উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিতেও ছাত্রীদের নিয়ে সচেতনতা শিবির ও বিনামূল্যে ন্যাপকিন বিতরণ করেন তারা। সেই দীর্ঘ প্রচেষ্টারই এক চূড়ান্ত ও সফল রূপ পেল এই প্যাড এটিএম। এর ফলে এখন আর কারও কাছে চাইতে হবে না, সংকোচ বোধ করে দোকানেও যেতে হবে না। এটিএম থেকেই নিজেদের প্রয়োজনীয় স্যানিটারি প্যাড সহজে সংগ্রহ করতে পারবেন মহিলারা।




