নিউজ ডেস্ক: আজকের ঝাঁ-চকচকে কলকাতার বুকেই লুকিয়ে রয়েছে এমন এক ইতিহাস, যা শুনলে গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য। আধুনিকতার চাদরে ঢাকা চেতলা অঞ্চলের খাস হাট রোডে গেলেই দেখা মিলবে এক অদ্ভুত ও অভূতপূর্ব দৃশ্যের। সেখানে এক প্রাচীন মন্দিরে দেবী কালী কোনও মুক্ত হস্তে পুজো পান না, বরং মায়ের দুই হাত সবসময় মোটা লোহার শিকল দিয়ে গর্ভগৃহের স্তম্ভের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা থাকে! কিন্তু কেন? কেন বিশ্বচরাচরের মুক্তিদাত্রী মা নিজেই এখানে বন্দি? এই রহস্যের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বিশ্বাস, ভক্তি এবং অতিপ্রাকৃত কিছু গা-ছমছমে লোককথা।
শোনা যায়, এই মন্দিরের মা কালী অত্যন্ত চঞ্চলা ও জাগ্রত। বহু বছর আগে, যখন এই অঞ্চলে জনবসতি ছিল না, চারপাশ ছিল নিঝুম, তখন নাকি গভীর রাতে মায়ের বিগ্রহ নিজের স্থান থেকে একাই নড়ে যেত! স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরা গল্প অনুযায়ী, নিশুতি রাতে গর্ভগৃহের ভিতরে দেবীর হেঁটে বেড়ানোর শব্দ স্পষ্ট শোনা যেত। মায়ের এই উগ্র ও চঞ্চল রূপকে শান্ত করতে এবং তাঁকে এক স্থানে স্থির রাখতেই নাকি প্রথমবার লোহার শিকল দিয়ে দেবীর হাত বেঁধে রাখার প্রথা চালু হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, মা যাতে তাঁর সন্তানদের ছেড়ে কোথাও চলে না যান, তাই এই ভালোবাসার বাঁধন।
https://www.facebook.com/share/v/1CFRWN2hF8/
তবে এই শিকলে বাঁধা রূপের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডাকাত সংস্কৃতির এক দুর্ধর্ষ অধ্যায়। পরাধীন বাংলায় যখন এই অঞ্চল গভীর জঙ্গলে ঘেরা ছিল, তখন রাজত্ব ছিল কুখ্যাত রঘু ডাকাত এবং নীলু-ভুলু ডাকাতদের। রঘু ডাকাত ছিল মা কালীর পরম ভক্ত। যেকোনও বড় ডাকাতি বা নরবলির অভিযানে বেরোনোর আগে সে মায়ের পুজো দিত। কিন্তু মায়ের প্রতি তার ভক্তির মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত অধিকারবোধ ও ভয়ের মিশেল। রঘু ডাকাত ভাবত, সে যখন অভিযানে চলে যাবে, মা হয়তো তাকে ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাবেন! মায়ের ওপর এই অদ্ভুত জোর খাটিয়েই সে ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে প্রতিমার দুই হাত লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে যেত, যাতে মা কোথাও পালিয়ে যেতে না পারেন।
এই ডাকাতদের ডেরা ঘিরেই জড়িয়ে রয়েছে মা সারদা দেবীর এক অলৌকিক কাহিনি। একবার তারকেশ্বর যাওয়ার পথে ডাকাতরা মা সারদাকে একা পেয়ে অপহরণ করে তাদের এই গোপন আস্তানায় নিয়ে আসে। কিন্তু বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে যখন আটকে রাখা হয়, তখন ডাকাত সর্দারেরা যা দেখেছিল, তাতে তাদের রক্ত হিম হয়ে যায়। মা সারদার স্থানে তারা দেখতে পায় স্বয়ং দশমহাবিদ্যার রূপিণী কালীর ভয়াল প্রতিচ্ছবি! ভয়ে ও ভক্তিতে ডাকাতরা মায়ের পায়ে লুটিয়ে পড়ে এবং মায়ের এই রূপের চিরস্থায়ী আরাধনা শুরু করে। ১৯৬৮ সালে যখন চেতলায় নতুন করে এই মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন রঘু ডাকাতের সেই গা-ছমছমে ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়েই আজও প্রতিমা গড়ার পর মায়ের দুই হাত শিকল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়।
আজও অমাবস্যার রাতে বা কালীপুজোর দিন এই মন্দিরে তান্ত্রিক মতে পুজো হয়। হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান শিকলে বাঁধা মায়ের এই অদ্ভুত ও জাগ্রত রূপ দর্শন করতে। বিজ্ঞান ও যুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও চেতলার এই ডাকাত কালী মন্দির আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভক্তি ও ইতিহাসের মিলনস্থলে আজও এমন কিছু রহস্য বেঁচে রয়েছে, যা মানুষের মনকে স্তব্ধ করে দেয়। আপনিও কি কখনও দর্শন করেছেন লোহার শিকলে বাঁধা এই জাগ্রত দেবীকে? কমেন্ট করে জানান আপনার অভিজ্ঞতা!




