নিউজ ডেস্ক: আজ উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী শচীন দেব বর্মনের জন্মদিন। ১৯০৬ সালের ১লা অক্টোবর বাংলাদেশের কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন ‘এস ডি বর্মণ’ বা পরম শ্রদ্ধায় ‘শচীন কর্তা’। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সেতারবাদক ও ধ্রুপদী সংগীত শিল্পী। বাবার কাছেই গ্রহণ করেন সংগীতের প্রথম তালিম। শাস্ত্রীয় সংগীতের পাঠ নিলেও তাঁর সংগীতভাবনার শিকড় প্রোথিত ছিল বাংলার মাটি, নদী আর মেঠো সুরে। সেখানের রাখালিয়া বাঁশি, ভাটিয়ালি গান, বাউল-ফকিরদের একতারা তাকে মুগ্ধ করতো।
১৯৩২ সালে, শচীনদেব বর্মণের প্রথম রেকর্ড বেরোয় হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে। ১৯৩৪ সালে বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে ঠুংরি গেয়ে গোল্ড মেডেল জিতেছিলেন তিনি। হিন্দি ও বাংলা মিলিয়ে ১০০টির বেশি ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেছেন। জনপ্রিয়তার দৌলতে, বিজ্ঞাপনের মডেলও হয়েছিলেন। তিনি ২ বার (১৯৫৫ ও ১৯৭৪) সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং ১৯৭০ সালে শ্রেষ্ঠ নেপথ্য গায়ক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এমন প্রতিভাবান সংগীত শিল্পী একবার ১৯৩১-এ এইচএমভি-র অডিশনে ব্যর্থ হন; তাকে বলা হয়েছিল তাঁর উচ্চারণ ও কণ্ঠস্বর রেকর্ডিংয়ের অনুপযুক্ত।
কুমিল্লায় থাকাকালীন কাজী নজরুল ইসলামের সাথে শচীনদেবদের বন্ধুত্বের সূত্রপাত। শচীনদেব নজরুলের চারটি গানও রেকর্ড করেছিলেন। নজরুলকে তিনি ডাকতেন, ‘কাজিদা’। নজরুল তাঁকে বলতেন, ‘চাটগেঁয়ে’; যদিও চট্টগ্রামের সঙ্গে শচীনের কোনও সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। রাজবাড়ির নিশ্চিন্ত আরাম ছেড়ে, কলকাতায় এসেছিলেন শচীন। তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর বন্ধ হয়েছিল রাজকোষের মাসোহারা। ভবানীপুরে একখানা ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন।
রেওয়াজ শুনে, বাড়িওলা বলেছিলেন , ‘সাতসকালে কাকের মতো চেঁচাও কেন!’ ওখানের ঘর ছেড়ে এলেন পালিত স্ট্রিটে, ভাড়াবাড়িতে। শুরু করলেন গানের টিউশনি। সঙ্গে, নানা জলসায়, জমায়েতে, সুযোগ পেলেই গাইতেন। সুযোগ আসছিল বাংলা গান গাওয়ার, গাইছিলেনও; তবে, চাইছিলেন হিন্দি গানেও চেষ্টা করতে। হিন্দি গান রেকর্ডিংয়ের পর জানলেন, তাঁর বদলে গাইবেন পাহাড়ি সান্যাল কারণ প্রবাসী হিসেবে তাঁর হিন্দি, স্বাভাবিকভাবেই শচীনের থেকে ভাল।
কিছুটা রাগেই কলকাতা ছাড়লেন শচীন দেব।
বিখ্যাত উপন্যাসিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ে গেলেন তাঁকে বম্বে। শহরের শেষমাথায়, বোরিভেলিতে ছোট্ট আস্তানা। কিছুদিন পর, এক গুজরাতি পরিবারে, ফ্ল্যাট ভাড়া পেলেন। গুজরাতি সংস্কারে সাধারণত আমিষ খাওয়াটা মহাপাপ। এদিকে, চিরবাঙালি শচীনের মাছ ছাড়া চলে না। একদিন সকালে রান্নার সময়ে, ঢুকে পড়লেন বাড়িওয়ালা। শচীন দেব , তাঁর স্ত্রী, আর কাজের মেয়ে সকলে মিলে দ্রুত ধুপ জ্বালিয়ে মাছের গন্ধ তাড়ানোর চেষ্টায় সামিল হলেন। কিশোর কুমারকে বড় ছেলে মনে করতেন শচীন।
রাহুল আর কিশোর ছিলেন ভালো বন্ধু। দুই ছেলের কাছেই তিনি ফেলে-আসা উন্মুক্ত সবুজ, নদীনালা, দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ ও ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়ার স্মৃতিচারণ করতেন। মুম্বাইয়ের মতো মায়ানগরীতে বসেও নিজের অন্তরে চিরকাল লালন করেছিলেন পদ্মাপারের মাটির গন্ধ। তাই হয়তো ওনার স্ত্রী মীরা দেব বর্মনের লেখা ‘সব ভুলে যাই, তাও ভুলি না বাংলা মায়ের কোল’ গানটি তিনি গেয়েছিলেন।
