নয়াদিল্লি: কয়েক হাজার ফুট ওপরে তখন ছুটে চলেছে যাত্রীবাহী বিমান। গন্তব্য ইজরায়েলের তেল আভিভ। হঠাৎ ককপিটের ভিতরেই শুরু ভয়াবহ সংঘর্ষ। ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত হলেন বিমানের ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। অভিযোগ, সহ-পাইলটই তাঁকে আক্রমণ করে বিমানের নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেন। মুহূর্তের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট নীচে নেমে যায়। কিন্তু সেই চরম আতঙ্কের মধ্যেও হাল ছাড়েননি মুম্বইয়ের এই ভারতীয় পাইলট। গুরুতর আহত অবস্থাতেও তিনি ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা অভিযুক্ত সহ-পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং বিমানের দায়িত্ব নেয় দ্বিতীয় একটি পাইলট দল। শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করে। বিমানে থাকা ১৭৪ জন যাত্রী প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনাটি সামনে আসার পরই আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। ভারতীয় এই পাইলটকে তাঁর সাহসিকতার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘হিরো’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও তাঁকে ‘সত্যিকারের হিরো’ বলে প্রশংসা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর সাহসিকতার কথা উল্লেখ করেছেন। নেতানিয়াহুর বক্তব্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত হয়েও মাচ্ছার প্রতিরোধ করেন এবং ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার ফলে যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ পান।
কে এই স্মিত মাচ্ছার?
মুম্বইয়ের ঘাটকোপার ইস্টের বাসিন্দা স্মিত মাচ্ছারের বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা দীর্ঘ। Reuters-এর প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিমান চালানোর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। পরবর্তী সময়ে নিউ জিল্যান্ডে প্রশিক্ষণ নেন এবং প্রায় ১৫ বছরের পেশাগত উড়ান-অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেওয়ার আগে তিনি প্রায় ১১ বছর SpiceJet-এ কাজ করেন। ২০২২ সালে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন এবং Boeing 737 বিমানের ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর প্রোফাইল অনুযায়ী, Boeing 737-800 ও 737 MAX 8/9 মিলিয়ে তাঁর প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা উড়ানের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের ক্যাপ্টেন হওয়ার আগে SpiceJet-এ তিনি সিনিয়র কমান্ডার হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২০ সালে তিনি লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেনের দায়িত্বও পান, অর্থাৎ অন্য পাইলটদের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই হয়তো চরম সংকটের মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে তাঁর পরিচিতদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি পেশাগত জীবনে নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন।
কী হয়েছিল সেই বিমানে?
৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানটি দুবাই থেকে তেল আভিভের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। উড়ানের মাঝপথে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়। ইজরায়েলি কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং যাত্রীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সহ-পাইলট ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন এবং বিমানটিকে বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিমানটি দ্রুত প্রায় ১৪ হাজার ফুট নীচে নেমে যায়। এরপর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা হস্তক্ষেপ করেন এবং বিমানে থাকা অন্য পাইলটদের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। শেষ পর্যন্ত বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করে।
আহত ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত সহ-পাইলটকে সৌদি কর্তৃপক্ষ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ঘটনার পিছনে তাঁর উদ্দেশ্য কী ছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও জানিয়েছেন, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার মূল কারণ ও অভিযুক্তের পটভূমি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হবে।
ঘটনার পর বিমান নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইজরায়েল জানিয়েছে, সে দেশে যাতায়াতকারী পাইলটদের নিরাপত্তা যাচাই আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার আগে ঘটনার উদ্দেশ্য বা কোনও সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়নি।
একদিকে ককপিটে ভয়াবহ হামলা, অন্যদিকে মাটিতে নামার আগেই প্রাণ বাঁচানোর লড়াই, এই পুরো ঘটনায় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ভূমিকা এখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। গুরুতর আহত অবস্থাতেও তাঁর নেওয়া পদক্ষেপ যাত্রী ও ক্রুদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ করে দেয়। তাই ৩০ সেপ্টেম্বরের সেই কয়েকটি মিনিট এখন শুধু একটি বিমানের জরুরি অবতরণের গল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে চরম বিপদের মুহূর্তে একজন পাইলটের দায়িত্ববোধ, সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধির গল্প।
