নিউজ ডেস্ক: বর্ধমানের সোঁয়াই গ্রাম। আর পাঁচটা গ্রামের থেকে এই গ্রামকে আলাদা করেছে মুখোপাধ্যায় পরিবারের ৩২৫ বছরেরও বেশি পুরনো দুর্গাপুজো। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক প্রাচীন রীতি, লোককথা এবং ইতিহাস। কথিত আছে, একসময় এই পরিবারের দুর্গার কাঠামো নিয়ে যাওয়ার পথে রাজার পথ আটকে যায়। কিসের এত হাঙ্গামা, তা জানতে রাজা স্বয়ং এগিয়ে আসেন। জানতে পারেন, মা দুর্গার কাঠামো নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ধর্মপ্রাণ রাজা সঙ্গে সঙ্গে রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ান।

এই পুজোর ইতিহাস শুরু হয় ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে। তখন দিল্লির মসনদে ঔরঙ্গজেব। সোঁয়াই গ্রামে থাকতেন মুখোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষ বাসুদেব মুখোপাধ্যায়। তিনি আদপে ফরিদপুরের মানুষ ছিলেন। টোলে পড়াশোনার জন্য সোঁয়াইয়ে এসে স্থানীয় এক পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করে সেখানেই থেকে যান।

কথিত আছে, একদিন স্বপ্নাদেশে মা দুর্গা তাঁকে জানান, ফরিদপুরে তাঁর পৈতৃক ভিটেতে দেবীর কাঠামো পড়ে রয়েছে এবং তাঁর পুজো হচ্ছে না। এরপর চার পুত্র ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাসুদেববাবু ফরিদপুরে যান। সেখান থেকে পারিবারিক দুর্গার কাঠামো কাঁধে করে সোঁয়াইয়ে ফিরিয়ে আনেন। সেই কাঠামোয় মাটি লেপে ও রং করে শুরু হয় দুর্গাপুজো।
পুজো সাড়ম্বরে করার জন্য পরিবারকে জমি, পুকুর ও সম্পত্তি দান করা হয়েছিল বলেও জানা যায়। আজও পুরনো পারিবারিক পুঁথি মেনে পুজো হয়। প্রতিমা একচালার, সাজ ডাকের। প্রতিমা তৈরির দায়িত্বও বংশপরম্পরায় সূত্রধর পরিবারের হাতে রয়েছে। ডাকের সাজ করেন দাস বৈরাগ্য পরিবার।

এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হল গ্রামের সকলকে নিয়ে উৎসব পালন। পুজোর তিন দিন মুখোপাধ্যায় বাড়িতে পাত পেড়ে সকলকে ভোগ-প্রসাদ খাওয়ানোর রীতি রয়েছে। মহাষষ্ঠীর কল্পারম্ভ দিয়ে পুজো শুরু হয়। মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোয় বিশেষ ভিড় হয়। মহানবমীতে ছাগ, আখের পাশাপাশি মোষ বলির রীতিও এখনও রয়েছে।

এছাড়াও তিন দিন ধরে গব্য ঘৃতের মহাপ্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার রীতি রয়েছে। বিসর্জনের পর দেবীর কাঠামো তুলে যত্ন করে রাখা হয়। পরের বছর সেই কাঠামোয় ফের খড়, মাটি ও রঙের প্রলেপ পড়ে। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সোঁয়াইয়ের এই বনেদি দুর্গাপুজো আজও বাংলার এক জীবন্ত ঐতিহ্য হয়ে টিকে রয়েছে।