বাংলার রাজনীতিতে দেওয়াল শুধু ইট-সিমেন্টের কাঠামো নয়, ক্ষমতার পালাবদল, দলের অন্দরের সংঘাত কিংবা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণেরও বার্তাবাহক। সেই দেওয়ালই মঙ্গলবার ফের নতুন বিতর্কের জন্ম দিল। মধ্য কলকাতার একাধিক এলাকায় হঠাৎই দেখা গেল একটি পোস্টার। নিশানায় তৃণমূল ছেড়ে এনডিএ-শরিক এনসিপিআই (NCPI)-এ যোগ দেওয়া সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
পোস্টারের ভাষা ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণে ভরা— 'বেইমান আর চোরটা, নয়না দিদির বরটা'। তবে এই ভাষার থেকেও বেশি চমকে দিয়েছে পোস্টারের শেষ লাইন। সেখানে লেখা, 'প্রচারে তাপস রায় এবং কুণাল ঘোষ'।
এতেই শুরু রাজনৈতিক জল্পনা! কারণ, তাপস রায় এখন বিজেপি সরকারের মন্ত্রী। অন্যদিকে কুণাল ঘোষ এখনও কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের অন্যতম মুখ। আদর্শ, সংগঠন এবং রাজনৈতিক অবস্থানে তাঁরা এখন দুই বিপরীত শিবিরে। তা হলে কি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করতে গিয়ে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের নেতার মধ্যে অঘোষিত কোনও সমঝোতা তৈরি হয়েছে? নাকি এই দুই নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছে?
প্রশ্ন উঠতেই মুখ খুলেছেন দুই নেতাই। দু'জনেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ওই পোস্টারের সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্ক নেই।মন্ত্রী তাপস রায়ের বক্তব্য, "পোস্টারে শুধু তাপস রায় লেখা হয়েছে। সেখানে কোথাও মন্ত্রী তাপস রায় লেখা নেই। তাই সেটি আমিই— এমনটা ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। এই পোস্টারের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।" যদিও এরপরই তিনি এমন একটি মন্তব্য করেন, যা নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করেছে। তাঁর দাবি, উত্তর কলকাতায় সাধারণ মানুষ এবং তৃণমূলের বহু কর্মী দীর্ঘদিন ধরেই সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ক্ষুব্ধ। সেই ক্ষোভ থেকেই এমন পোস্টার পড়ে থাকতে পারে।
তাপসের এই মন্তব্য নিছক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়। কারণ, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক লড়াই বহু দিনের। একসময় দু'জনেই ছিলেন তৃণমূলে। পরে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে তাপস বিজেপিতে যোগ দেন এবং উত্তর কলকাতায় সুদীপের বিরুদ্ধেই প্রার্থী হন। যদিও জিততে পারেননি। পরে মানিকতলা থেকে বিধায়ক হয়ে বর্তমানে বিজেপি সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য তিনি।
অন্যদিকে কুণাল ঘোষও পোস্টারের দায় অস্বীকার করেছেন। তবে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেননি। কুণালের কথায়, "আমি পোস্টারের কথা শুনেছি। খোঁজও নিচ্ছি। কিন্তু এই পোস্টারের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। তবে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যে বেইমানির অভিযোগ উঠছে, সেটা নিয়ে আমার অবস্থান নতুন নয়। অতীতেও বহুবার প্রকাশ্যে একই কথা বলেছি।" তাঁর আরও প্রশ্ন, "যদি পোস্টারে উল্লেখিত তাপস রায় বর্তমান মন্ত্রী হন, তা হলে তিনি তো অন্য দলের। আমরা একসঙ্গে পোস্টার করতে যাব কেন? মত মিলতে পারে, কিন্তু যৌথ প্রচারের প্রশ্নই ওঠে না।"
পোস্টারের সময়টাই কি আসল বার্তা?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পোস্টারের ভাষার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তার সময়। তৃণমূল ছেড়ে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক সাংসদ সম্প্রতি এনডিএ-শরিক এনসিপিআই-এ যোগ দিয়েছেন। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার স্বীকৃতির পর সুদীপ সেই দলের সংসদীয় নেতা হয়েছেন। মঙ্গলবারই এনডিএ-র বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা এনসিপিআইয়ের। রাজনৈতিক মহলের জল্পনা, খুব শীঘ্রই সুদীপদের বিজেপিতে আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে। এই আবহেই কলকাতার রাস্তায় এমন পোস্টারকে অনেকেই নিছক কাকতালীয় বলে মানতে নারাজ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে জনসমক্ষে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। আবার অন্য অংশের মত, তাপস রায় ও কুণাল ঘোষ— দুই পরিচিত নামকে ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ছড়ানোই ছিল পোস্টারের মূল উদ্দেশ্য।
নয়নাকে টেনে বার্তা, নীরব সুদীপ
পোস্টারে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী তথা তৃণমূল বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কেও পরোক্ষে টেনে আনা হয়েছে। যদিও নয়না এখনও দাবি করে চলেছেন, তিনি কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সঙ্গেই রয়েছেন।
কুণাল ঘোষও সেই প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “নয়নাদি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী। সুদীপবাবু যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছেন, সেগুলি নিয়ে তাঁকে বোঝানোর দায়িত্ব তাঁরই ছিল।” তবে এত বিতর্ক, এত জল্পনার মধ্যেও এখনও পর্যন্ত মুখ খোলেননি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন একটাই— মধ্য কলকাতার দেওয়ালে সাঁটা এই পোস্টার কি শুধুই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, নাকি ২০২৬-পরবর্তী বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের প্রথম প্রকাশ্য ইঙ্গিত?
এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত সময়ই দেবে।