আলিপুরদুয়ার : এক দিকে আগুনে পুড়ছে চোরাশিকারিদের ফেলে যাওয়া বন্যপ্রাণীর দেহাংশ। অন্য দিকে পিলখানায় কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে দুই হস্তীশাবক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের নতুন পরিচয়—‘চৈতন্য’ এবং ‘সুলক্ষণা’। আর সেই একই মঞ্চ থেকে ঘোষণা, ডুয়ার্সের এই সবুজ ভূখণ্ডকে শুধু দেশীয় পর্যটনের গন্তব্য নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রেও আরও বড় করে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্ব গণ্ডার দিবসে মঙ্গলবার আলিপুরদুয়ারে যেন একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং পর্যটনের দুই ছবি ফুটে উঠল।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উত্তরবঙ্গ সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল কালচিনির সুভাষিণী চা বাগানের মাঠে বন দফতরের আয়োজিত বিশ্ব গণ্ডার দিবসের অনুষ্ঠান। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম আলিপুরদুয়ারে তাঁর সফর। আর প্রথম সফরেই ডুয়ার্সের জঙ্গল, বন্যপ্রাণী, চা-বাগান এবং পর্যটনকে ঘিরে একাধিক বার্তা দিলেন তিনি।
হাসিমারা বায়ুসেনা ছাউনিতে পৌঁছে সেখান থেকে সুভাষিণী চা বাগানের মাঠে যান মুখ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের আগে বন দফতরের বিভিন্ন প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। গণ্ডার, হাতি-সহ ডুয়ার্সের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্র নিয়ে তৈরি প্রদর্শনীগুলিতে নজর দেন তিনি। এর পর তাঁর গন্তব্য জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান।
জলদাপাড়ার পিলখানায় পৌঁছে দুই হস্তীশাবকের নামকরণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। একটি হল ‘চৈতন্য’, অন্যটি ‘সুলক্ষণা’। পিলখানার সেই দুই ছোট অতিথিকে ঘিরে মুহূর্তেই তৈরি হয় আলাদা আবহ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সরকারি উদ্যোগের প্রতীকী ছবির সঙ্গে জুড়ে যায় নতুন দুই নামও।
তবে এ দিনের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে কড়া বার্তা ছিল চোরাশিকারিদের বিরুদ্ধে। বন্যপ্রাণী হত্যা করে তাদের দেহাংশের অবৈধ কারবার বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপের কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযানে বাজেয়াপ্ত করা গণ্ডারের শিং-সহ বন্যপ্রাণীর দেহাংশ এ দিন ধ্বংস করা হয়। বন দফতরের হিসাবে, প্রায় ১৪২ কেজি এমন সামগ্রী ধ্বংস করা হয়েছে।
বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—বন্যপ্রাণীর দেহাংশ কোনও ভাবেই যেন ফের অবৈধ বাজারে পৌঁছতে না পারে। চোরাশিকারিদের হাত থেকে হাতি, গণ্ডার এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করতে বন দফতরকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
কিন্তু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেই থামেননি মুখ্যমন্ত্রী। জঙ্গলকে ঘিরে যে অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, সেই পর্যটনকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। আলিপুরদুয়ারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
ডুয়ার্সের শক্তি তার জঙ্গল। জলদাপাড়ার একশৃঙ্গ গণ্ডার, হাতির পাল, গরুমারা, বক্সা, নদী-জঙ্গল, পাহাড়ের পাদদেশের চা-বাগান—প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যই পর্যটনের মূল সম্পদ। সেই সম্পদকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আলিপুরদুয়ারকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে।
তবে জঙ্গল ও পর্যটনের সঙ্গে ডুয়ার্সের আর একটি অবিচ্ছেদ্য পরিচয়—চা। সেই চা-শিল্পও এ দিনের বক্তব্যে জায়গা পেয়েছে। বন্ধ চা-বাগান খোলার উদ্যোগের পাশাপাশি চা শ্রমিকদের ২০ শতাংশ বোনাস দেওয়ার কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ জঙ্গল থেকে পর্যটন, পর্যটন থেকে চা—উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির একাধিক স্তরকে একই পরিকল্পনার মধ্যে রাখার বার্তা এসেছে আলিপুরদুয়ার থেকে।
বিশ্ব গণ্ডার দিবসের দিনটির তাৎপর্যও তাই আলাদা। যে প্রাণীকে কেন্দ্র করে গোটা কর্মসূচি, তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে চোরাশিকার এখনও বড় হুমকি। গণ্ডারের শিংয়ের অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক স্তরেও দীর্ঘদিন ধরে অভিযান চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাজেয়াপ্ত শিং ধ্বংস করার কর্মসূচি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়—চোরাশিকারিদের কাছে প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি প্রতীকী পদক্ষেপও।
আর সেই আগুনের ঠিক পরেই দুই হস্তীশাবকের নামকরণ। একটি ‘চৈতন্য’, অন্যটি ‘সুলক্ষণা’। যেন একই অনুষ্ঠানে ধ্বংস এবং সৃষ্টির দুই ছবি। এক দিকে চোরাশিকারের স্মারক পুড়িয়ে ফেলা, অন্য দিকে জঙ্গলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নতুন নামে ডাকা।
বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাওঁ প্রতীকী গণ্ডারের ছবি দেওয়া উত্তরীয় পরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বরণ করেন। অনুষ্ঠানে বন দফতরের আধিকারিক, প্রশাসনের কর্তারা এবং স্থানীয় প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
উত্তরবঙ্গ সফরের এই কর্মসূচিতে তাই আলিপুরদুয়ারকে ঘিরে সরকারের বার্তাটি ছিল বহুমুখী। বন্যপ্রাণী থাকবে সুরক্ষিত, জঙ্গল হবে পর্যটনের সম্পদ, চা-বাগানের অর্থনীতি পাবে গতি—আর সেই তিনকে মিলিয়েই ডুয়ার্সকে আরও বড় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যটনের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সহজ নয়। পর্যটন পরিকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয়ই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মঙ্গলবার আলিপুরদুয়ার থেকে অন্তত সেই লক্ষ্যেই নতুন করে পথ চলার বার্তা দিল রাজ্য সরকার।
একই দিনে আগুনে পুড়ল চোরাশিকারিদের ‘লুঠ’, আর পিলখানায় দুই হস্তীশাবক পেল নতুন নাম। সেই দুই ছবির মাঝখানেই উঠে এল ডুয়ার্সের আগামী দিনের স্বপ্ন—জঙ্গল বাঁচিয়ে, বন্যপ্রাণী বাঁচিয়ে, আলিপুরদুয়ারকে পৌঁছে দেওয়া বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে।