এক সময় মধ্যপ্রদেশের পরিচয় ছিল ঘন অরণ্য, মোগলির গল্প আর বাঘের রাজত্ব। এখন সেই রাজ্যই যেন এক কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে—বাঘ বাঁচবে, না মানুষ? নাকি এই সংঘাতে হারবে দু’পক্ষই?
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে মধ্যপ্রদেশে বন্যপ্রাণীর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫০ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৫টিরও বেশি বাঘের। সংখ্যার নিরিখে ঘটনাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভারতের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর সংকটের ছবি।
মধ্যপ্রদেশ এখন দেশের ‘টাইগার স্টেট’। ২০২২ সালের সরকারি গণনায় সেখানে বাঘের সংখ্যা ছিল ৭৮৫। বন দফতরের অনুমান, বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বাঘের সংখ্যা যত দ্রুত বেড়েছে, তাদের জন্য নিরাপদ জঙ্গল কি ততটা বেড়েছে?
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে বাঘের হামলাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ৫০ জনের মধ্যে ২২ জনের প্রাণ গিয়েছে বাঘের আক্রমণে। বুনো শুয়োরের হামলায় মারা গিয়েছেন আট জন, হাতির আক্রমণে সাত জন, ভালুকের হামলায় চার জন এবং চিতাবাঘের আক্রমণে এক জন। মৃতদের মধ্যে ১৬ জন মহিলা ও কিশোরী। অর্থাৎ সংঘাতের আগুন পৌঁছে গিয়েছে বনপ্রান্তের প্রায় প্রতিটি পরিবারের দরজায়।
আরও উদ্বেগের বিষয়, অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটেছে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে। এই সময় তেন্দুপাতা ও মহুয়া সংগ্রহের মরসুমে বহু আদিবাসী ও বননির্ভর পরিবার জীবিকার সন্ধানে জঙ্গলে প্রবেশ করেন। অন্য দিকে, গ্রীষ্মের তাপে জল ও খাদ্যের খোঁজে বন্যপ্রাণীরাও বনাঞ্চলের বাইরে চলে আসে। ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর দূরত্ব দ্রুত কমে যায়, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় সংঘাত।
সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে মহাকৌশল অঞ্চলে, বিশেষত সেওনি এবং বান্ধবগড়ের আশপাশে। যে অরণ্য এক সময় ‘দ্য জঙ্গল বুক’-এর অনুপ্রেরণা হয়েছিল, সেই জঙ্গলেই আজ মানুষ ও বাঘ মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। আবার ছত্তীসগঢ় সীমান্ত ঘেঁষা অনুপপুর, শাহদোল ও সিধিতে বাড়ছে হাতির আনাগোনা। অর্থাৎ সমস্যা আর শুধু বাঘকেন্দ্রিক নয়; গোটা বনবাস্তুতন্ত্রই চাপের মুখে।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ জঙ্গল ও মানুষের বসতির ক্রমবর্ধমান মিশ্রণ। নতুন রাস্তা, রেললাইন, খনি, কৃষিজমি ও জনবসতি বনের স্বাভাবিক করিডর কেটে দিচ্ছে। পূর্ণবয়স্ক বাঘ নিজের এলাকা দখল করলে তরুণ বাঘ নতুন অঞ্চল খুঁজতে বাধ্য হয়। সেই খোঁজেই তারা কখনও গ্রামে, কখনও চাষের জমিতে, কখনও মানুষের যাতায়াতের পথে চলে আসে। অন্য দিকে, বননির্ভর মানুষও প্রতিদিন জীবিকার জন্য জঙ্গলে প্রবেশ করেন। ফলে সংঘর্ষ প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে।
এই সংঘাতের আর এক করুণ দিক হল বাঘের মৃত্যুও। চলতি বছরের আট মাসে ৪৫টির বেশি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বার্ধক্য, রোগ বা বাঘে-বাঘে লড়াইয়ের পাশাপাশি রয়েছে চোরাশিকার, বিষপ্রয়োগ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, রাস্তা ও রেললাইনে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। গত বছরও মধ্যপ্রদেশে বাঘমৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছিল।
প্রশ্ন উঠছে, তবে কি সংরক্ষণের সাফল্যই নতুন সংকট ডেকে আনছে?
উত্তর সহজ নয়। বাঘের সংখ্যা বাড়া নিঃসন্দেহে ভারতের সাফল্য। কিন্তু সেই সাফল্য টেকসই করতে গেলে শুধু বাঘ গণনা নয়, প্রয়োজন নিরাপদ করিডর, বনপ্রান্তের গ্রামগুলিতে আগাম সতর্কবার্তা, দ্রুত ক্ষতিপূরণ, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানের নতুন নীতি।
কারণ, জঙ্গলের এই লড়াইয়ে আসলে কোনও পক্ষের জেতা নেই। যে দিনে মানুষ মারা যায়, সে দিন হার হয় সভ্যতার। আর যে দিনে একটি বাঘ মারা যায়, সে দিন হার হয় প্রকৃতির। মধ্যপ্রদেশ আজ সেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।