হাসপাতালের বেডে ভর্তি ছিলেন। চিকিৎসাও চলছিল। কিন্তু হঠাৎই দেখা গেল, নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে নেই রোগী! আর এক জন নয়, একই দিনে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে দুই চিকিৎসাধীন রোগীর ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়াল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, দু’জনই ‘অ্যাবসকন্ডিং’ অর্থাৎ চিকিৎসকদের না জানিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গিয়েছেন। বিষয়টি পুলিশকেও জানানো হয়েছে। অন্য দিকে, রোগীদের পরিজনদের দাবি, তাঁরা হাসপাতালেই রোগীদের খুঁজে পাননি।
নিখোঁজ দুই রোগীর নাম বিমল ঘোষ (৫১) এবং দীপান্বিতা রায়। তাঁদের মধ্যে দীপান্বিতা চিৎপুরের বাসিন্দা বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। তিনি আরজি করের ট্রমা কেয়ার ইউনিটের (TCU) একটি ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন। শুক্রবার রাত থেকে তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিৎপুর থানায় জানিয়েছে। অন্য দিকে, বিমলকে অন্য একটি হাসপাতাল থেকে রেফার করে আরজি করে পাঠানো হয়েছিল। জ্বর এবং হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার কারণে তাঁকে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। শুক্রবার পরিবারের সদস্যেরা হাসপাতালে এসে রোগীকে দেখতে না পেয়ে খোঁজ শুরু করেন। সেখানেই তাঁরা জানতে পারেন, বিমল ওয়ার্ডে নেই। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়।
একই দিনে দু’জনের ছুটি হওয়ার কথা ছিল
ঘটনার আরও একটি দিক সামনে এসেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে। হাসপাতালের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, দুই রোগীরই শুক্রবার ছুটি হওয়ার কথা ছিল। হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী, বিকেলের পরে কোনও রোগীর ছুটি হলে সাধারণত দুপুরের খাবার খেয়ে হাসপাতাল থেকে বেরোনোর কথা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা, দীপান্বিতা এবং বিমল দুপুরের খাবার খাওয়ার আগেই হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে যান। এই কারণেই হাসপাতালের তরফে ঘটনাটিকে ‘অ্যাবসকন্ডিং কেস’ হিসাবে পুলিশকে জানানো হয়েছে। তবে দু’জন রোগী ঠিক কখন ওয়ার্ড থেকে বেরিয়েছেন, তাঁরা হাসপাতালের কোন পথ দিয়ে বাইরে গিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কেউ ছিলেন কি না—এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
পরিবার এসে রোগীকে না পেয়ে খোঁজ
বিমলের ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রথম নজরে আসে তাঁর পরিবারের সদস্যেরা হাসপাতালে যাওয়ার পর। তাঁরা রোগীকে ওয়ার্ডে না পেয়ে সিস্টারকে বিষয়টি জানান। এর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং পুলিশকে জানানো হয়। দীপান্বিতার ক্ষেত্রেও শুক্রবার রাত থেকে তাঁর খোঁজ না মেলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিৎপুর থানায় বিষয়টি জানায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দু’জন রোগীর ছুটি যদি নির্ধারিতই হয়ে থাকে, তা হলে তাঁরা হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় নথিপত্র বা আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলেন কি না।
সিসিটিভি-সহ একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখার সম্ভাবনা
দুই রোগীর ‘অ্যাবসকন্ডিং’ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট চেয়েছে। হাসপাতালের ভিতর থেকে তাঁরা কী ভাবে বেরিয়েছিলেন, সেই সংক্রান্ত তথ্যও খতিয়ে দেখা হতে পারে। পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে, ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে হাসপাতালের গেট পর্যন্ত তাঁদের গতিবিধি সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আরজি কর হাসপাতালের সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায় শনিবার বলেন, “বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছি।” অর্থাৎ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও আপাতত ঘটনার পূর্ণ বিবরণ হাতে পেতে চাইছে।
‘নিখোঁজ’ না ‘নিজে থেকেই চলে যাওয়া’?
এই ঘটনায় আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটাই। হাসপাতালের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই রোগীরই শুক্রবার ছুটি হওয়ার কথা ছিল এবং তাঁরা সম্ভবত ছাড়পত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার আগেই চলে যান। সেই কারণে ঘটনাটিকে ‘অ্যাবসকন্ডিং’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু পরিবারের কাছে বিষয়টি অন্য রকম। তাঁরা হাসপাতালে এসে রোগীকে পাননি এবং পরে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তদন্তে তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দুই রোগী নিজের ইচ্ছায় হাসপাতাল ছেড়েছিলেন কি না, তাঁদের সঙ্গে কেউ ছিলেন কি না এবং হাসপাতাল থেকে বেরোনোর সময় কোনও সমস্যা হয়েছিল কি না।
একই দিনে আরজি কর থেকে দুই চিকিৎসাধীন রোগীর উধাও হওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই হাসপাতালের নিরাপত্তা ও রোগী-নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আপাতত হাসপাতালের রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্তের দিকেই নজর।