ওয়াশিংটন: আকাশ থেকে ছিটকে পড়েছিলেন ইরানের মাটিতে। প্যারাশুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঘণ্টায় প্রায় ৭০ থেকে ১০০ মাইল বেগে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। ভেঙে যায় পিঠ, হাত ও কাঁধ। চারদিকে শত্রুসেনার তল্লাশি। হাতে সামান্য অস্ত্র, আশ্রয় বলতে পাহাড়ের একটি সরু ফাটল। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় ৫০ ঘণ্টা লুকিয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হন মার্কিন বায়ুসেনার এক কর্নেল। এতদিন পর প্রথমবার নিজের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে জানালেন তিনি।
মিশন কল সাইন ‘Dude 44 Bravo’ নামে পরিচিত ওই মার্কিন কর্নেল ছিলেন F-15E Strike Eagle যুদ্ধবিমানের Weapons Systems Officer। এপ্রিল মাসে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি অভিযানের সময় বিমানটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভেঙে পড়ে। তাঁর সঙ্গে বিমানে ছিলেন পাইলট, যিনি ‘Alpha’ নামে পরিচিত। দু’জনই বিমান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই Alpha-কে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কিন্তু Bravo নিখোঁজ ছিলেন প্রায় দু’দিন।
CBS-এর ‘60 Minutes’-এ সাংবাদিক Norah O'Donnell-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের বেঁচে ফেরার কাহিনি জানান Bravo। CBS News-এর তথ্য অনুযায়ী, ২ এপ্রিল রাতে ইসফাহানের দক্ষিণে পাহাড়ি এলাকার কাছে তাঁদের মিশন ছিল। লক্ষ্য ছিল ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত শিল্পকেন্দ্রে হামলা চালানো।
কিন্তু আচমকাই তাঁদের F-15E একটি ইরানি shoulder-fired missile-এর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। Bravo-র কথায়, যুদ্ধের আর পাঁচটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল সেই দিন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়। বিমানে আগুন ও বিপজ্জনক ক্ষতি দেখে দু’জনকে ইজেক্ট করতে হয়।
সেখানেই শুরু হয় আরও ভয়াবহ অধ্যায়। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে Bravo-র প্যারাশুট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে তিনি কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মাটির দিকে পড়তে থাকেন। মাটিতে আছড়ে পড়ার পর গুরুতর চোট পান। কিন্তু তখনও থামার সুযোগ ছিল না। শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়লে বিপদ আরও বাড়ত।
নিজের SERE Survival, Evasion, Resistance and Escape প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে পাহাড়ের একটি ফাটলে আশ্রয় নেন তিনি। উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগের locator beacon-ও যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করেন, যাতে ইরানি বাহিনী তাঁর অবস্থান শনাক্ত করতে না পারে। CBS-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানি সেনারা কখনও কখনও তাঁর অবস্থান থেকে মাত্র কয়েকশো মিটারের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল।
এরপর শুরু হয় এক জটিল উদ্ধার অভিযান। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, Bravo-কে ইতিমধ্যেই উদ্ধার করে ইরান থেকে সড়কপথে বের করে আনা হয়েছে,এমন ধারণা তৈরি করতে CIA একটি deception operation চালায়। একইসঙ্গে গোপন প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁর সঠিক অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলে।
শেষ পর্যন্ত মার্কিন Special Operations বাহিনী ইরানের ভেতরেই একটি অস্থায়ী landing strip তৈরি করে। উদ্ধার অভিযানে পাঠানো দুটি C-130 বিমান সেখানে আটকে পড়ে। পরে আরও বিমান ও হেলিকপ্টার পাঠাতে হয়। প্রযুক্তি শত্রুর হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় আটকে পড়া বিমান ও হেলিকপ্টার ধ্বংস করে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রায় ৫০ ঘণ্টা পর Easter Sunday-এর সকালে Bravo-কে উদ্ধার করা হয়। সেই মুহূর্তকে তিনি নিজের জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে তাঁর কাছে এই ঘটনা শুধুমাত্র ব্যক্তিগতভাবে বেঁচে ফেরার গল্প নয়। তাঁর মতে, এটি প্রশিক্ষণ, দলগত কাজ, নেতৃত্ব, বিশ্বাস এবং ‘কাউকে পিছনে না ফেলে আসার’ প্রতিশ্রুতিরও গল্প। ইরানের মাটিতে ৫০ ঘণ্টার সেই লড়াই তাই এখন মার্কিন সামরিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত উদ্ধার অভিযানের অংশ হয়ে উঠেছে।