কলকাতা: চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সুবিচারের আশায় রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের দ্বারস্থ হচ্ছেন একের পর এক মানুষ। কিন্তু অভিযোগ জানিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও সমাধান না মেলায় প্রশ্ন উঠছে, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে সাধারণ মানুষ সুবিচার পাবেন কবে? কাউন্সিলের অচলাবস্থার জেরে গত কয়েক মাসে একাধিক অভিযোগের শুনানি কার্যত আটকে রয়েছে।
এই পরিস্থিতির অন্যতম উদাহরণ হাওড়ার বাসিন্দা রাকেশ মাইতি। তাঁর অভিযোগ, এক চিকিৎসকের দেওয়া একটি ইঞ্জেকশন নেওয়ার পর থেকেই কোমরের নীচে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। ধীরে ধীরে তাঁর হাঁটাচলার ক্ষমতা কমে যায়। পরে চিকিৎসকেরা তাঁকে অ্যাভাসকুলার নেক্রোসিসে আক্রান্ত বলে জানান। হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করালেও এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি।
রাকেশের দাবি, তাঁর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইঞ্জেকশনটি তাঁর শারীরিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে পরবর্তী চিকিৎসকেরা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি বলে তাঁর দাবি।
রাকেশের মতোই সুবিচারের আশায় কাউন্সিলের দ্বারস্থ হয়েছেন পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরের বাসিন্দা জয়ন্ত রায় ও শিল্পী রায়। তাঁদের চার বছরের সন্তান অরণ্য রায়ের মৃত্যুকে ঘিরে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। গত ২ সেপ্টেম্বর শিশুটির মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক ভুয়ো চিকিৎসকের ভূমিকা ছিল। ঘটনার পর অরণ্যের বাবা-মা রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল, বিধাননগর দক্ষিণ থানা এবং স্বাস্থ্য ভবনে গিয়ে অভিযোগ জানান।
একদিকে ব্যক্তিগত অভিযোগের নিষ্পত্তির অপেক্ষা, অন্যদিকে কাউন্সিলের অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা দুইয়ের জেরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, গত ছ’মাসে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে কার্যত কোনও নিয়মিত শুনানি হয়নি। কতগুলি মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে, সেই সংখ্যাও স্পষ্ট নয়।
কাউন্সিলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে একাধিক চিকিৎসক সংগঠন। তাঁদের অভিযোগ, সভাপতি ও সহ-সভাপতির মধ্যে প্রশাসনিক টানাপড়েন এবং বৈঠক না হওয়ার কারণে কাউন্সিলের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু রোগী বা তাঁদের পরিবারের উপর নয়, চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কাজেও পড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, নিয়ম মেনেই কাজ হচ্ছে। তাঁর দাবি, কাউন্সিলের অধীনে একাধিক পেনাল ও এথিক্যাল কমিটি রয়েছে এবং সেই কমিটিগুলির চেয়ারম্যানদেরও বৈঠক ডাকার দায়িত্ব রয়েছে। কাউন্সিলকে আন্দোলনের জায়গায় পরিণত করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
সহ-সভাপতি সুশান্ত রায়ের বক্তব্য, নিয়ম মেনেই কাজ করা হচ্ছে এবং শুধু অভিযোগ করলেই হবে না, অভিযোগের প্রমাণও দিতে হবে।
তবে এই অচলাবস্থা নিয়ে এবার সরব হয়েছেন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও। তাঁর বক্তব্য, নৈতিক দিক থেকে সভাপতি সুদীপ্ত রায়ের পদত্যাগ করা উচিত। তিনি পদত্যাগ না করলে পরবর্তী কী পদক্ষেপ করা যায়, তা নিয়ে সচিব পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।
সব মিলিয়ে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। অভিযোগের শুনানি কবে শুরু হবে, আটকে থাকা মামলাগুলির নিষ্পত্তি কবে হবে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষ কোথায় দ্রুত সুবিচার পাবেন এখন সেই উত্তরই খুঁজছেন রাকেশ মাইতি থেকে অরণ্য রায়ের বাবা-মায়ের মতো বহু পরিবার।
