নয়াদিল্লি, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: একসঙ্গে ৩৬০ কনটেনার। দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৩ কিলোমিটার। তাও আবার একটি কনটেনারের উপর আর একটি—ডাবল স্ট্যাক। পণ্য পরিবহণে এমনই এক নজির গড়ল ভারতীয় রেল। দেশের ইতিহাসে প্রথম বার ডাবল-স্ট্যাক লং-হল কনটেনার ট্রেন চালানো হল ওয়েস্টার্ন ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডরে। মুম্বইয়ের জওহরলাল নেহরু পোর্ট (JNPT) থেকে গুজরাতের ভদোদরা ডিভিশনের বর্ণমায় কনকর গুডস কার্গো টার্মিনাল পর্যন্ত প্রায় ৪২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে এই ট্রেন।
শুক্রবার রাত ৭টায় JNPT থেকে যাত্রা শুরু করে ট্রেনটি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছয় ভদোদরা ডিভিশনের বর্ণমায়। রেলের এই ‘লং-হল’ গঠনে ছিল দু’টি ডাবল-স্ট্যাক রেক। অর্থাৎ একই ট্রেনে উপর-নীচে সাজানো কনটেনার নিয়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য বহন করা হয়েছে। দুই রেক মিলিয়ে এক বারেই ৩৬০ TEU—‘টুয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট’—পণ্য পরিবহণ করা হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। পুরো ট্রেনটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১.৩ কিলোমিটার। ফলে সাধারণ মালগাড়ির তুলনায় একসঙ্গে অনেক বেশি পণ্য বহনের ক্ষমতা দেখাল এই ট্রেন। রেলের হিসাবে, একটি যাত্রাতেই বেশি পণ্য সরানো গেলে পরিবহণের দক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে বন্দরে এবং টার্মিনালে পণ্য ওঠানামার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
রেলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রথম রেকটিতে ছিল ৪৫টি লোড এবং তার ওজন ছিল প্রায় ১,৮১৭ টন। সেটিকে টেনেছে ৬০৩১১ নম্বর লোকোমোটিভ। দ্বিতীয় রেকটিতেও ছিল ৪৫টি লোড, যার মোট টনেজ প্রায় ২,১০৫ টন। ওই অংশটিকে টেনেছে ২৪৬৯০ নম্বর লোকোমোটিভ। দু’টি রেক একসঙ্গে চলেই ৩৬০ TEU পণ্য পৌঁছে দিয়েছে গন্তব্যে।
এই সাফল্যের কথা জানিয়ে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব ট্রেনটির ভিডিয়ো প্রকাশ করেছেন।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও এই ঘটনাকে ভারতের পণ্য পরিবহণ ও লজিস্টিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ওয়েস্টার্ন ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডরে JNPT থেকে ভদোদরা পর্যন্ত ১.৩ কিলোমিটারের ডাবল-স্ট্যাক কনটেনার ট্রেন দেশের ‘ফ্রেট ও লজিস্টিক’ ক্ষমতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষা? মূল কারণ, একটি ট্রেনেই বেশি পণ্য। একই পরিমাণ রেলপথ ব্যবহার করে বেশি কনটেনার গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া গেলে প্রতি ইউনিট পণ্য পরিবহণের খরচ কমানোর সুযোগ থাকে। পণ্য পরিবহণে রেলের ব্যবহার বাড়লে বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এতে লজিস্টিক খরচ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
এর আর একটি বড় দিক হল সড়ক পরিবহণের উপর চাপ কমানো। একই যাত্রায় যদি আরও বেশি পণ্য রেলে সরানো যায়, তা হলে একই পরিমাণ পণ্য পরিবহণে প্রয়োজনীয় ট্রাকের সংখ্যা কমতে পারে। ফলে মহাসড়কে যানজট কমার পাশাপাশি জ্বালানি খরচও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে এই ট্রেন বৈদ্যুতিক রেলে চলায় পরিবহণের কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে।
আর এই গোটা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ওয়েস্টার্ন ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর। যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে একই রেলপথ ভাগ করে নেওয়ার বদলে পণ্য পরিবহণের জন্য তৈরি এই করিডরেই দীর্ঘ এবং ভারী মালগাড়ি চালানোর সুবিধা রয়েছে। ডাবল-স্ট্যাক কনটেনার বহনের উপযোগী পরিকাঠামোর ফলে একই ট্রেনে উল্লম্ব ভাবে দু’স্তরে কনটেনার বসানো সম্ভব হচ্ছে।
রেলের কাছে এই যাত্রা তাই শুধু একটি পরীক্ষামূলক পরিষেবা নয়। এর লক্ষ্য আরও বড়—বন্দর থেকে দেশের বাজারে পণ্য পৌঁছনোর সময় কমানো, এক ট্রেনে বেশি পণ্য বহন করা এবং সামগ্রিক লজিস্টিক খরচ কমানো। ১.৩ কিলোমিটারের এই ট্রেন সেই ভবিষ্যতেরই প্রথম বড় বার্তা।