দিব্যেন্দু ঘোষ
আকাশে আজ মেঘের আনাগোনা। হাওয়ায় বৃষ্টির গন্ধ। ঠিক এমন এক দিনে মনে পড়ে যায় সেই কবির কথা, যিনি আঠারো বছর বয়সে লিখেছিলেন, ‘আঠারো বছর বয়স কি দুঃসহ/স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি’। তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্য। আমাদের চিরসবুজ, চিরবিদ্রোহী কবি। তাঁর জন্ম শতবার্ষিকী আমাদের সামনে একটা বড় প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে, আমরা কি সত্যিই মনে রেখেছি এই কবিকে? আজকের যান্ত্রিক বাঙালি কি আদৌ পড়ে সুকান্তকে?
সুকান্তর ছোট জীবন
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি মারা যান। ১৯৪৬ সালের ১৩ মে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। মাত্র কুড়ি-একুশ বছরের জীবনে তিনি যা লিখে গেছেন, তা আজও আমাদের শিহরিত করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হল ‘ছাড়পত্র’, ‘ঘুম নেই’, ‘পূর্বাভাস’, ‘মিঠেকড়া’ এবং ‘অভিযান’। তাঁর লেখা ‘হে মহাজীবন’ বা ‘রানার’ কবিতাগুলো পড়লে আজও মনে হয়, কবির কলম যেন আমাদের ঘরের অন্দরের কথা বলছে।
আমরা কি সত্যিই মনে রেখেছি?
প্রশ্নটা খুব কঠিন। আমরা কি সুকান্তকে মনে রেখেছি? ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৫ আগস্ট এলে আমরা দু-একটি খবরের কাগজে বিশেষ সংখ্যা বের করি। দু-একটি সাহিত্য সভায় তাঁর কবিতা আবৃত্তি হয়। তারপর আবার সেই আগের মতোই ধুলো জমা পড়ে। সুকান্ত যে শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, আজকের সমাজ কি সেই মূল্যবোধ ধারণ করছে? না কি আমরা তাঁকে কেবল ‘কিশোর কবি’ বা ‘কমিউনিস্ট কবি’র তকমা দিয়ে এক কোণে সরিয়ে রেখেছি? সত্যি বলতে, আমরা তাঁকে মনে রেখেছি কেবল তাত্ত্বিকভাবে। তাঁর আদর্শের সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন।
আজকের বাঙালি কতটুকু পড়ে সুকান্তকে?
আজকের বাঙালি জীবন এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর ইউটিউবের দখলে। কবিতার বই কেনার ঝোঁক অনেক কমেছে। স্কুলজীবনের পাঠ্যবইয়ে ‘রানার’ বা ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতাগুলো পড়া হয় ঠিকই, কিন্তু পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার পর সেই বই অধিকাংশের কাছেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। অথচ সুকান্তের লেখার মধ্যে যে অদম্য জেদ আর প্রতিবাদের ভাষা আছে, তা আজকের সময়ের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ক্ষুধার জ্বালা, দারিদ্র্য, যুদ্ধের বিভীষিকা, সুকান্ত তো এগুলোর কথাই লিখে গেছেন। আজকের মানুষ নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করছে। কিন্তু সেই লড়াইয়ের ভাষাকে সুকান্তের কবিতার সঙ্গে মেলাতে আমরা ভুলে গেছি।
ইতিহাসের নিরিখে সুকান্ত
সুকান্তের জন্ম শতবার্ষিকী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তিনি কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় সংগঠক। তিনি ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালের ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’-এর সময় তিনি যে অমানবিক কষ্ট দেখেছিলেন, তা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। তাঁর ‘আকাল’ কবিতার প্রতিটা লাইন যেন সেই সময়ের মানুষের কান্নার ধ্বনি। তিনি কেন আজ প্রাসঙ্গিক? কারণ তিনি শিখিয়েছিলেন কীভাবে পরাজয়কে অস্বীকার করতে হয়। তিনি বলেছিলেন, ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/অবাক তাকায় রটে/জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়’। আজকের এই সংকটের সময়েও বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সুকান্তের এই উদ্দীপনা খুব দরকার।
কেন আমরা দূরে সরে গেলাম?
আমাদের পাঠ্যাভ্যাস বদলাচ্ছে। সাহিত্য এখন অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়ছে। সুকান্তের ভাষা খুব সহজ, খুব সরাসরি। হয়ত এই সরলতাই আমাদের কাছে তাঁকে কম ‘আধুনিক’ করে তুলেছে। আমরা এখন এমন সব কবিতা পড়তে চাই যা বুঝতে অনেক সময় লাগে। সুকান্তের কবিতা কোনও জটিল ব্যাখ্যা খোঁজে না, বরং তা হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। হয়ত আমরা সেই আঘাত সইতে ভয় পাই, তাই তাঁকে এড়িয়ে চলি।
সুকান্তের প্রতি আমাদের দায়িত্ব
সুকান্তের জন্ম শতবার্ষিকী শুধুই উৎসব নয়, আত্মসমালোচনার সময়। আমরা যদি সত্যিই সুকান্তকে সম্মান জানাতে চাই, তবে তাঁর বইগুলো আবার নতুন করে পড়তে হবে। কেবল পাঠ্যবই নয়, তাঁর গদ্য, তাঁর নাটক এবং চিঠিপত্রগুলোও পড়তে হবে। সুকান্তর কবিতায় যে মানবিকতা আছে, তা আজকের এই স্বার্থপর পৃথিবীতে খুব প্রয়োজন। আমাদের নতুন প্রজন্মকে সুকান্তর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া আমাদের বড় দায়িত্ব। বাবা-মা হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে আমাদের কাজ হল তাঁর জীবনের সেই লড়াকু মানসিকতা শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। তাঁকে শুধু ‘বিপ্লবী’ হিসেবে নয়, তাঁকে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে চেনা প্রয়োজন।
সুকান্ত ভট্টাচার্য হয়ত আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর কবিতা বেঁচে আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘কবিতা তুমি শোনো/আমাকেও নামতে দাও/তুমি কোনো দিন কি দেখেছ/আমার ক্ষুধিত মুখ?’ সুকান্তের এই ক্ষুধার্ত মুখ আজও বাংলার পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। আমরা কি পেরেছি তাঁকে সম্মান জানাতে? হয়ত না। তবে শতবার্ষিকী পেরিয়ে এসেও আমাদের কাছে সুযোগ আছে নতুন করে তাঁকে জানার। সুকান্তকে পড়া মানে নিজেকে চেনা। সুকান্তকে পড়া মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখা। আজকের এই যান্ত্রিক দিনে আমরা আরও একবার খুলে দেখতেই পারি ‘ছাড়পত্র’। দেখতেই পারি, সুকান্ত আজও আমাদের জন্য কী লিখে গেছেন। তিনি আজও অমর, কারণ তিনি বাঙালির চিরন্তন স্পর্ধার প্রতীক। তাঁকে আর বিস্মৃতির অন্ধকারে কেন ঠেলে দেব? বেঁচে থাকুক সুকান্ত, বেঁচে থাকুক তাঁর প্রতিবাদী কলম। কারণ, তাঁর কবিতার প্রতিটি অক্ষর আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। আমরা বাঙালি, আর বাঙালি হিসেবে সুকান্তকে অস্বীকার করা মানে নিজেকেই অস্বীকার করা। জন্ম শতবার্ষিকীতে সুকান্তের প্রতি হোক আমাদের সত্যিকারের শ্রদ্ধা, তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করা।