বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে দীর্ঘ নীরবতার পর মুখ খুললেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, যাকে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলন’ বা ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখেছে, সেটি আদৌ স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না। বরং নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। আর সেই পরিকল্পনার হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করা হয় ছাত্রদের।
দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “প্রথম দিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন ছিল। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অন্যদের হাতে। ছাত্রদের আবেগকে ব্যবহার করে দেশজুড়ে এমন এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল নির্বাচন ছাড়াই সরকারকে সরিয়ে দেওয়া।”
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, গোটা ঘটনাকে আন্তর্জাতিক স্তরে ‘গণআন্দোলন’ হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে এর নেপথ্যে ছিল সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি। তাঁর কথায়, “যদি প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্বাচন হতো, তা হলে আন্দোলনের পর ভোটের দাবিই জোরদার হতো। কিন্তু এখানে লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়।”
শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার প্রকৃত তদন্ত কখনও সম্পূর্ণ হতে দেওয়া হয়নি। তাঁর অভিযোগ, সরকার পতনের পর তদন্ত প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া হয় এবং কারা সহিংসতার নেপথ্যে ছিল, তা সামনে আসার আগেই সেই উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর মতে, “বাংলাদেশের মানুষ এখনও পুরো সত্য জানতে পারেননি।”
কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা আন্দোলন শুরু করেন। প্রথম দিকে আন্দোলনের মূল দাবি ছিল মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, কারফিউ, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘাতে পরিস্থিতি ক্রমশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।
সরকারি হিসাব এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেই আন্দোলনে বহু মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। শেষ পর্যন্ত প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশ ছাড়েন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়েও সরব
শুধু আন্দোলনের ব্যাখ্যাই নয়, আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা যায় না। তিনি বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সরিয়ে দেওয়া গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয়। জনগণই ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে, কে ক্ষমতায় থাকবে।”
একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানান, সুযোগ পেলে তিনি আবার দেশে ফিরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে চান। তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক লড়াই শেষ হয়ে যায়নি এবং দলের কর্মীরা এখনও সংগঠনকে পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পাল্টা দাবি অন্তর্বর্তী সরকারের
তবে শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এবং আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্র সংগঠনগুলি। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভ, প্রশাসনিক দমননীতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিই মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছিল। সরকার পতনের নেপথ্যে কোনও ‘ষড়যন্ত্র’ নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্ষোভই ছিল মূল কারণ।
নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়তে শুরু করেছে। ঠিক এই সময় শেখ হাসিনার এমন মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাঁর বক্তব্যকে ‘বাস্তব চিত্র’ বলে দাবি করলেও বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নিজের অবস্থানকে ন্যায্য প্রমাণ করতেই এই ব্যাখ্যা তুলে ধরছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার এই মন্তব্য আগামী দিনে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রকৃতি, তার নেপথ্যের শক্তি এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনী রাজনীতি, এই তিনটি প্রশ্নই ফের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।