নয়াদিল্লি: মহাকাশের কালো অন্ধকার। দূরে অসংখ্য নক্ষত্রের ঝিকিমিকি। তার নীচে পৃথিবীর চারপাশে লালচে আলোর আস্তরণ। আর সেই আলোর পর্দা ভেদ করে যেন ধীরে ধীরে উঠে আসছে উজ্জ্বল শুক্রগ্রহ। তারও নীচে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিদ্যুতের বেগুনি ঝলকানি। পৃথিবী ও মহাকাশের এই অভূতপূর্ব দৃশ্যই এবার ক্যামেরাবন্দি করলেন নাসার মহাকাশচারী ডন পেটিট।
১৮ সেপ্টেম্বর সমাজমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করেন পেটিট। তাঁর ক্যামেরায় একই ফ্রেমে ধরা পড়েছে মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি, শুক্রগ্রহ, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের লালচে ‘এয়ারগ্লো’ এবং নীচে ঝড়ের মধ্যে বিদ্যুতের বেগুনি ঝলক। ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পরই মহাকাশপ্রেমীদের মধ্যে তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পেটিট ছবিটির বর্ণনা দিতে গিয়ে জানিয়েছেন, মিল্কি ওয়ের অসংখ্য নক্ষত্রের মধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের আবছা লাল আভার ভিতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে উজ্জ্বল শুক্র। তার নীচে দেখা যাচ্ছে বিক্ষিপ্ত বেগুনি বিদ্যুৎ চমক। তাঁর ভাষায়, যেন অসংখ্য নক্ষত্রের মাঝে ঝড়ে উত্তাল দুই জগত একসঙ্গে জ্বলজ্বল করছে।
তবে ছবির সবচেয়ে নজরকাড়া অংশ শুধু শুক্রগ্রহ নয়। পৃথিবীর চারপাশে যে লালচে আবছা আলো দেখা যাচ্ছে, সেটি ‘এয়ারগ্লো’। এটি পৃথিবীর উপরের বায়ুমণ্ডলে স্বাভাবিক ভাবেই তৈরি হওয়া অত্যন্ত ক্ষীণ আলোকচ্ছটা। সূর্যের বিকিরণে বায়ুমণ্ডলের পরমাণু ও অণুগুলি শক্তি পেয়ে উত্তেজিত হয়। পরে তারা সেই অতিরিক্ত শক্তি আলো বা ফোটন হিসেবে ছেড়ে দিলে তৈরি হয় এই আলোকচ্ছটা। নাসার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এয়ারগ্লো দেখতে অরোরার মতো হলেও দু’টির উৎস এক নয়—অরোরা মূলত সৌরবায়ু থেকে আসা উচ্চ-শক্তির কণার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর এয়ারগ্লো তৈরি হয় স্বাভাবিক সৌর বিকিরণের প্রভাবে।
মহাকাশ থেকে শুক্রকে দেখা অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। পৃথিবী থেকে শুক্রগ্রহকে খালি চোখেও দেখা যায় এবং এটি আমাদের রাতের আকাশের অন্যতম উজ্জ্বল প্রাকৃতিক বস্তু। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন থেকেও অতীতে মহাকাশচারীরা পৃথিবীর দিগন্তের কাছে শুক্রের ছবি তুলেছেন। কিন্তু পেটিটের সাম্প্রতিক ছবির বিশেষত্ব হল—একই ফ্রেমে গ্রহ, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের লাল আভা, বজ্রপাত এবং মিল্কি ওয়ের অসংখ্য নক্ষত্র একসঙ্গে ধরা পড়েছে।
ছবিটি প্রকাশের পর সমাজমাধ্যমেও শুরু হয় প্রশংসার ঝড়। কেউ লিখেছেন, শুক্র, মিল্কি ওয়ে এবং বজ্রপাত—তিনটি দৃশ্য এক ছবিতে ধরা পড়া সত্যিই অসাধারণ। আবার কেউ মহাকাশ থেকে পাওয়া এই দৃশ্যকে ‘পৃথিবীর বাইরের এক অবিশ্বাস্য ছবি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
পৃথিবীর মাটি থেকে যে আকাশকে আমরা রাতের অন্ধকারে দেখি, মহাকাশ থেকে সেই পৃথিবীকেই যেন সম্পূর্ণ অন্য এক গ্রহ বলে মনে হয়। লালচে বায়ুমণ্ডল, দূরের শুক্র, অসংখ্য নক্ষত্র আর নীচে ঝড়ের বিদ্যুৎ—ডন পেটিটের ক্যামেরায় ধরা পড়া এই দৃশ্য সেই অচেনা পৃথিবীরই এক বিরল মুহূর্ত।